চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পারস্য উপসাগরে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার অজুহাতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক সংঘাতের ফলে গত ১৭ জুনের দুই দেশের মধ্যকার ‘স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সমঝোতা স্মারক’ (MoU) এখন পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) দিবাগত রাতে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে এই হামলা চালায়।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশেই সর্বশেষ এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
“আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসন ও বৈরি আচরণের সরাসরি জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। মূলত ইরানের সামরিক নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, উপকূলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাঁটি এবং ড্রোন সংরক্ষণাগার ও মাইন বসানোর (Minelayer) সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে মার্কিন যুদ্ধবিমান।”
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের কৌশলগত সিরিক বন্দরের কাছে তাহরুই গ্রামসংলগ্ন এলাকায় গভীর রাতে বিকট শব্দে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। উল্লেখ্য, গত শুক্রবারের প্রথম দফার মার্কিন হামলার মূল কেন্দ্রও ছিল এই এলাকাটি। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কেশম দ্বীপেও’ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে ইরানি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
হামলা শুরু হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী তেহরান যদি তাদের নৌ-আগ্রাসন বন্ধ না করে, তবে শনিবারের এই হামলা আরও ভয়াবহ ও তীব্র আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতের স্রেফ একটি পূর্বাভাস মাত্র।
ইরান বারবার যুদ্ধবিরতির শর্ত বা সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে—এমন অভিযোগ তুলে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “সম্ভবত তারা (ইরান) কখনোই শিক্ষা নেবে না।” তিনি আরও যোগ করেন:
“এমন একটি সময় অচিরেই আসতে পারে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর কোনো ধরনের সংযম দেখানো সম্ভব হবে না। আমরা যে সামরিক অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছি, তা চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করতে বাধ্য হব। আর যদি সত্যিই তা ঘটে, তাহলে পৃথিবীর মানচিত্রে ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
”মার্কিন সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে ২ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল নিয়ে যাওয়ার সময় পানামার পতাকাবাহী ‘এম/টি কিকু’ (M/T Kiku) নামক একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। শুক্রবারের মার্কিন হামলার পর ইরানকে চুক্তি মেনে চলার সুযোগ দেওয়া হলেও তেহরান তা গ্রহণ করেনি বলেই এই দ্বিতীয় দফার হামলা।
অন্যদিকে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরের জলসীমায় আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিয়ম ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করায় তারা কেবল জাহাজটির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনার পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত অন্তত ৮টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

