ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দফায় দফায় চলা এই সহিংসতায় পুলিশের সার্কেল কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক নেতাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় উভয় পাশে কয়েক হাজার যানবাহন আটকা পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
আজ রোববার (২৮ জুন ২০২৬) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার হামিরদী ও মানিকদাহ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এই রণক্ষেত্রের সূত্রপাত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রণক্ষেত্র:
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মানিকদাহ ইউনিয়নের সুলতান মাতুব্বরের সমর্থক এবং হামিরদী ইউনিয়নের সিরু মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
আজ সকাল ৮টার দিকে সেই বিরোধের জেরে দুই পক্ষের হাজারো গ্রামবাসী ঢাল, শড়কি, রামদাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে অবস্থান নেয় এবং একপর্যায়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা ও নেতাসহ আহত অর্ধশতাধিক:
সংঘর্ষের খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভাঙ্গা থানাসহ একাধিক থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে উত্তেজিত জনতা পুলিশের ওপরও চড়াও হয়। দুই পক্ষের ইটপাটকেল ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন:
ভাঙ্গা থানার পুলিশের সার্কেল কর্মকর্তা (এএসপি);
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানসহ একাধিক পুলিশ সদস্য;
উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম এবং দায়িত্ব পালনরত বেশ কয়েকজন সাংবাদিক।
আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মহাসড়ক অবরুদ্ধ, চরম যাত্রী দুর্ভোগ:
সংঘর্ষের মূল কেন্দ্রবিন্দু মহাসড়ক সংলগ্ন হওয়ায় সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত এই রুটে ঢাকাগামী এবং আমতলী-বরিশালগামী দূরপাল্লার নৈশকোচ, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকসহ কয়েক হাজার যানবাহন আটকা পড়ে। তীব্র গরমে বাসের ভেতর আটকে থাকা শিশু ও বৃদ্ধসহ হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের টিয়ার শেল ও অতিরিক্ত ফোর্স:
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সুলতান মাতুব্বর ও সিরু মোল্লার সমর্থকদের মাঝে এই সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে একাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল (কাঁদানে গ্যাস) নিক্ষেপ করতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুরুতে পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে জেলা সদর (ফরিদপুর) থেকে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ ও বিশেষ ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুপুর ১১টার পর মহাসড়ক থেকে লাঠিয়ালদের হটিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

