শীমুল চৌধুরী, লেখক ও নির্মাতা:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার ১১০ দিন পর গত ১৭ জুন এক নাটকীয় মোড় দেখলো বিশ্ব। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU)’ নামের একটি ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তি বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করলেও, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর প্রশ্ন উস্কে দিয়েছে: এটি কি শুধুই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শান্তির কোনো রূপরেখা?
পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সমঝোতাটি মূলত একটি সাময়িক কৌশলগত লেনদেন, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, এই চুক্তির মাধ্যমে তার সাময়িক সমাধান এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৬০ দিন কোনো শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
যুদ্ধের ফলে পঙ্গুপ্রায় ইরানি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি এনেছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ‘ওয়েভার’ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ। এর ফলে ইরান অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানি করতে পারবে এবং বিদেশে আটকে থাকা শত শত কোটি ডলারের তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধের কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ইরান কেবল তার ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়ামের মজুদ আইএইএ (IAEA)-এর নজরদারিতে কমিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে। তাছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, যা ট্রাম্পের ভাষায়, “আশেপাশের দেশগুলোর শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা প্রয়োজন।”
আগামীতে কী ঘটতে পারে? সম্ভাব্য তিন দৃশ্যপট আলোচনা করা দরকার। এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ মাত্র ৬০ দিন। আগামী দুই মাসে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তার তিনটি প্রধান সম্ভাব্য দিক নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
এই চুক্তির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো—ইসরায়েল এর কোনো পক্ষ নয়। চুক্তির প্রথম দফায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী সামরিক অভিযান বন্ধের’ কথা বলা হলেও, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে পারেন। যদি লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকে, তবে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ পাল্টা আঘাত হানবে, যা এই চুক্তিকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কাগজের টুকরোয় পরিণত করতে পারে।
২. মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ট্রাম্পের হুমকি। যাতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র চার দিনের মাথায়, ২১ জুন ২০২৬ এ ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন কিছু আক্রমণাত্মক পোস্টের প্রতিবাদে সুইজারল্যান্ডে চলমান টেকনিক্যাল আলোচনা থেকে ইরানি প্রতিনিধি দল সাময়িকভাবে ওয়াকআউট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থীরা এই চুক্তিকে “ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ” হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের ওপর এই অভ্যন্তরীণ চাপ যত বাড়বে, ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো ততটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইরান এই সময়টিকে মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার এবং সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের একটি ‘টাইম-বাইং’ বা সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
৩. $৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল ও দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সমঝোতা
চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য ধারা হলো, আঞ্চলিক অংশীদারদের নিয়ে ইরানের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করা। যদি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি আলোচক দল সুইজারল্যান্ডে একটি টেকনিক্যাল ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা হতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো – যারা যুদ্ধের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছিলো। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই বিশাল পুনর্গঠন তহবিলে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
মোট কথা হলো, ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী শান্তি আনেনি, বরং এটি বারুদ ভর্তি ঘরে একটি সাময়িক দেওয়াল তৈরি করেছে মাত্র। চুক্তিতে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক যেমন, ইয়েমেনের হুথি বা ইরাকের মিলিশিয়া বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো মৌলিক জটিলতাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যা ইজরাইলের নিরাপত্যার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। আগামী ৬০ দিন বিশ্ব রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাবে। যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তবে হরমুজ প্রণালির এই সাময়িক উন্মুক্ততা কেবল আরও একটি বড় ও ভয়াবহ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।

