আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল:
দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। ১৩৭ বছরের গৌরবময় পথচলা পেরিয়ে আজও প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞান, মানবিকতা ও আলোকিত সমাজ গঠনের প্রতীক হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গত ১৪ জুন নানা আয়োজন, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে কলেজটির ১৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুন মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত তাঁর পিতা ব্রজমোহন দত্তের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন কলেজ। শিক্ষিত, সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজও সেই আদর্শই বিএম কলেজের মূল শক্তি।
সবুজে ঘেরা প্রায় ৬০ একর আয়তনের মনোরম ক্যাম্পাস, শতবর্ষ গেট, ঐতিহাসিক মূল ভবন, জীবনানন্দ চত্বর, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতিফলক, নাগলিঙ্গম, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও জারুলের রঙিন সৌন্দর্য শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রকৃতি ও জ্ঞানচর্চার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাস বরিশালের অন্যতম দর্শনীয় শিক্ষাঙ্গন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে অনার্স শিক্ষা চালুর মাধ্যমে কলেজটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। বর্তমানে ২২টি বিষয়ে অনার্স এবং ২১টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় চালু হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম। বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে। রয়েছে ১১টি একাডেমিক ভবন, সাতটি আবাসিক হল, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, অডিটরিয়াম, প্রশাসনিক ভবন ও ক্যানটিনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
শিক্ষার পাশাপাশি বিতর্ক, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, বিজ্ঞানচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, রক্তদান ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামে বিএম কলেজের অবদান গৌরবোজ্জ্বল। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে কলেজের ৪২ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শহীদ হন। এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। কবি জীবনানন্দ দাশ এবং দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মতো কৃতী ব্যক্তিত্বের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই বিদ্যাপীঠের সঙ্গে।
তবে শতবর্ষের ঐতিহ্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ ও কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামের সংকট, কিছু বিভাগে শিক্ষকস্বল্পতা, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বিএম কলেজ দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সত্য, প্রেম ও পবিত্রতার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বিএম কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি বরিশালের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবসম্পদ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১৩৭ বছরের গৌরবময় যাত্রা শেষে আজও এই বিদ্যাপীঠ নতুন প্রজন্মকে আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছে। সমৃদ্ধ বিএম কলেজ মানেই সমৃদ্ধ বরিশাল—এই বিশ্বাসই আজও অটুট।

