সুলতান মাহমুদ , দিনাজপুর:
একসময় শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী ও বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর থাকত দিনাজপুর জেলা ও দায়রা জজ কোর্টের সামনের সড়কের পুরাতন বইয়ের বাজার। কম দামে প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহের জন্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় জমাতেন এখানে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে।
পাঠাভ্যাস কমে যাওয়া, অনলাইনে বই ও পিডিএফের সহজলভ্যতা এবং শিক্ষাক্রমে পরিবর্তনের কারণে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে পুরাতন বইয়ের বাজার। ফলে জীবিকার সংকটে পড়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা।
দিনাজপুর জেলা ও দায়রা জজ কোর্টের সামনের সড়কে ভ্যানের ওপর প্রায় ৩৫টি পুরাতন বইয়ের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে পাঠ্যবই, সাহিত্য, ধর্মীয়, আইন, উপন্যাস, ইতিহাস ও চাকরির প্রস্তুতিমূলক এবং বিভিন্ন রেফারেন্স বই বিক্রি করা হয়। এক সময় এসব দোকানে বছরের বেশির ভাগ সময়ই ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও বর্তমানে দিন পার করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির উদ্যোগ, পুরাতন বইয়ের বাজারকে সুশৃঙ্খল করা এবং বইমুখী সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে এ খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই পুরাতন বইয়ের বাজার এক সময় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুরাতন বই বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, একসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত। শিক্ষার্থীরা নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরাতন বই কিনত। এখন মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটের কারণে অনেকেই বই পড়তে চায় না। আগের মতো বিক্রি নেই। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
আরেক বিক্রেতা মঞ্জু মিয়া বলেন, “আগে প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী পুরাতন বই কিনতে আসত। কিন্তু এখন পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস পরিবর্তন হওয়ায় আগের বছরের বইয়ের চাহিদা কমে গেছে। নতুন সংস্করণ বের হলে পুরাতন বই অনেক সময় বিক্রিই করা যায় না। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হয়।
পুরাতন বই ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। আগে দিনে যে পরিমাণ বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না। দোকান ভাড়া না থাকলেও সংসারের খরচ, পরিবহন ব্যয় ও বই সংগ্রহের খরচ বেড়েছে। অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তবে এখনও কম দামে বই কেনার জন্য কিছু ক্রেতা পুরাতন বইয়ের বাজারে আসেন।
দিনাজপুর সরকারী কলেজের শিক্ষার্থী রায়হান কবির বলেন, আমি কয়েকটি বই কিনতে এসেছি। এখানে নতুন বইয়ের তুলনায় অনেক কম দামে বই পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বেশ উপকারী।
ধর্মীয় বই কিনতে আসা মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “পুরাতন বইয়ের দোকানে অনেক সময় দুর্লভ ও ভালো মানের ধর্মীয় বই পাওয়া যায়। নতুন বইয়ের তুলনায় দামও কম। তাই মাঝে মধ্যেই এখানে আসি।
কলেজছাত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, “রেফারেন্স ও সাহিত্যবিষয়ক অনেক বই এখানে সহজে পাওয়া যায়। তবে আগের তুলনায় দোকানগুলোতে মানুষের উপস্থিতি কম দেখছি। বই পড়ার আগ্রহ বাড়ানো গেলে এ বাজার আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
দিনাজপুর প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক আকরাম হোসেন বাবলু বলেন, বই মানুষের জ্ঞান ও মননের বিকাশ ঘটায়। তাই ডিজিটাল যুগেও বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাহলেই পুরাতন বইয়ের বাজারের হারানো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে এবং এ পেশার সঙ্গে জড়িত শতাধিক মানুষের জীবিকাও সুরক্ষিত হবে।

