রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এখন পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। ২০২৬ সালের জুনে এসে এই যুদ্ধের চরিত্র এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন রূপ ধারণ করেছে। গ্রাউন্ডে বা মাঠপর্যায়ে যখন ফ্রন্টলাইনের যুদ্ধ একপ্রকার স্থবির—যেখানে ইউক্রেনীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে রাশিয়া নতুন কোনো ভূখণ্ড দখল করতে পারছে না, উল্টো কৌশলগত অবস্থান হারাচ্ছে—ঠিক তখনই আকাশপথের যুদ্ধ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আর এই আকাশযুদ্ধের মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘ড্রোন’। যে ড্রোন একসময় কেবল নজরদারির হাতিয়ার ছিল, তা এখন বড় বড় সামরিক পরাশক্তিদের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি ক্রেমলিন থেকে মাত্র ৯ মাইল দূরে অবস্থিত গাজপ্রম নেফতের মস্কো অয়েল রিফাইনারিতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে দু-দুটি বড় ড্রোন হামলা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শত শত ড্রোন প্রতিহতের দাবি করলেও, মস্কোর আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং জ্বালানি শোধনাগারের আগুন এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে—ইউক্রেন এখন সরাসরি মস্কোর গায়ে হাত দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এখানে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ধাঁধাটি হলো অস্ত্রের উৎস। যুদ্ধের শুরু থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বা ফ্রান্স তাদের দেওয়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন ATACMS বা স্টর্ম শ্যাডো) দিয়ে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার ক্ষেত্রে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে টোমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি টেবিলে এলেও শেষ পর্যন্ত কিয়েভের হাতে তা পৌঁছায়নি। তাহলে মস্কোর প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানছে কোন অস্ত্র?
বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার গভীরে হওয়া এই সফল হামলাগুলোর সিংহভাগই পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে হচ্ছে না, বরং হচ্ছে ইউক্রেনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র দিয়ে। এই ঘরোয়া অস্ত্র-বহরের প্রাণকেন্দ্র হলো ইউক্রেনের নিজস্ব ‘লিউতি’ (An-196 Lyutyi) ড্রোন। ১,৭০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনটি এআই (AI) চালিত মেশিন-ভিশন গাইডেন্স সিস্টেমে সমৃদ্ধ, যা রাশিয়ার শক্তিশালী জ্যামিং পরিবেশেও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। ইউক্রেনীয় মাটির নিরাপদ দূরত্ব থেকে উৎক্ষেপণ করেই রাশিয়ার তাতারস্তান, সেন্ট পিটার্সবার্গ কিংবা মস্কোর জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কেবল ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই রাশিয়ার ৩২টি তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে কিয়েভ, যা রাশিয়ার সামগ্রিক তেল পরিশোধন ক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যদিও এই দেশীয় প্রযুক্তির অস্ত্র উৎপাদনের নেপথ্যে ইউরোপের অর্থ ও প্রযুক্তির প্রচ্ছন্ন ছায়া রয়েছে, কিন্তু ইউক্রেনের এই ক্রমবর্ধমান আত্মনির্ভরশীলতা যুদ্ধের পুরো ব্যাকরণ বদলে দিয়েছে। তবে গ্রাউন্ডের স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে এই আঘাত রাশিয়ার ভেতরের সমীকরণকে জটিল করে তুলছে। মস্কোর ওপর হামলার সময় ভ্লাদিমির পুতিন কাজানে আঞ্চলিক সম্মেলনে ব্যস্ত ছিলেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে পার্লামেন্ট স্পিকারের মাধ্যমে “ব্যাপক গোষ্ঠীগত পাল্টা হামলার” হুমকি দিয়ে কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পুতিনের ব্যক্তিগত নীরবতা ইঙ্গিত দেয়, ক্রেমলিন এখনো এই নতুন ড্রোন-বাস্তবতার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জবাব খুঁজে পায়নি।
প্রশ্ন উঠছে, ইউক্রেন কি তবে এই নিয়মিত ড্রোন স্ট্রাইকের মাধ্যমে রাশিয়াকে এমন এক দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে চাইছে, যেখানে ক্রেমলিন তাদের প্রচলিত (Conventional) অস্ত্রের সীমানা পেরিয়ে চরম কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়? অনেক সামরিক বিশ্লেষকের ধারণা, কিয়েভের এই আগ্রাসী কৌশল আসলে রাশিয়াকে পারমাণবিক বা নিউক্লিয়ার অস্ত্র ব্যবহারের এক বিপজ্জনক উসকানি দিচ্ছে। ড্রোনের ডানায় ভর করে ইউক্রেন মস্কোর দোরগোড়ায় যে আগুন জ্বালিয়েছে, তা যদি পুতিনকে চরম কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, তবে এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা রূপ নেবে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে। এখন দেখার বিষয়, রাশিয়া কতক্ষণ তার প্রচলিত সামরিক শক্তির ওপর ভরসা রাখে, নাকি ড্রোনের এই চোরাগোপ্তা কামড়ের জবাবে পুতিন বিশ্বকে নতুন কোনো পারমাণবিক সংকটের মুখে ঠেলে দেন।

