সিলেট প্রতিনিধি :
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর আজ রোববার (১৪ জুন ২০২৬)। এখনো মেলেনি ক্ষতিপূরণ।
১৪ জুন বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি বেদনাবিধুর দিন। ১৯৯৭ সালের এই দিনে মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত ভয়াবহ বেল্টা-আউট শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দেশের গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ, বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক আঘাত। রোববার সেই ঘটনার ২৯ বছর পূর্ণ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ, পরিবেশ এবং রাষ্ট্র এখনো ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের প্রত্যাশায় রয়েছে।
এখনো বাংলাদেশ সেই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি। সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দেশের স্বার্থে আন্দোলনকারীরা এখনো সরব রয়েছেন।
মাগুরছড়া বেল্টা-আউট বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক ঘটনা, যা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, জ্বালানি নীতি, বহুজাতিক কোম্পানির জবাবদিহিতা এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার—এই চারটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ আদায় কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
লাউয়াছড়া অঞ্চলের বনাঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকা। বেল্টা-আউটের ফলে বিপুল সংখ্যক গাছপালা ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটে।
১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া এলাকায় ফুলবাড়ী চা-বাগানের সামনে অবস্থিত ১ নম্বর গ্যাস অনুসন্ধান কূপে খননকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। আকস্মিক এ বিস্ফোরণের পর আগুনের লেলিহান শিখা প্রায় ৬০০ ফুট উচ্চতায় উঠে যায়। সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য আজও স্থানীয়দের মনে ভেসে ওঠে।
১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয় মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল অব বাংলাদেশ লিমিটেডের। গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর পর এলাকায় ব্যাপক আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিটার কূপ খননের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। ৮৪০ মিটার খননের পরপরই ঘটে দুর্ঘটনা।
আগুনে চা-বাগান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বিদ্যুৎ লাইন, সিলেট-আখাউড়া রেলপথ, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ-শমশেরনগর-ব্রাহ্মণবাজার-কুলাউড়া সড়কপথ, গ্যাস পাইপলাইন, গ্যাস কূপ, গ্যাস রিজার্ভ, পরিবেশ ও পানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মারা যায় হাজার হাজার বন্যপ্রাণী ও পাখি।
টানা ১৫ দিন আগুন জ্বলার পর যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের ইন্টারন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির বিশেষজ্ঞ রিচার্ড চাইল্ডসহ চার সদস্যের একটি দল আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে পুরো কূপের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।
মাগুরছড়ায় সংঘটিত সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার জেলার মানুষ। বিপুল ক্ষতির পরও এলাকাবাসী এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।
তেল-গ্যাস বিশেষজ্ঞদের মতে, মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ডে ভূগর্ভস্থ উত্তোলনযোগ্য প্রায় ২৪৫.৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট (BCF) গ্যাস পুড়ে যায়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য ক্ষতি আরও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর অগ্নিকাণ্ডে মাগুরছড়া ও আশপাশের প্রায় ৮৭.৫০ একর এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ২৯টি চা-বাগানের প্রায় ৪৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৬৯.৫ হেক্টর এলাকায় হাজার হাজার গাছ পুড়ে যায়। সরকারের তদন্তে ক্ষতির পরিমাণ ৫০৭ কোটি টাকার বেশি ধরা হয়।
এ ছাড়া বনাঞ্চলের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরও হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। রেলপথ, সড়কপথ, গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ লাইনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। মাগুরছড়া খাসিয়া পানপুঞ্জির অধিবাসীদের পানবরজও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ফলে এ বনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্যাসকূপ খননের কাজে সাধারণত ডিনামাইট জাতীয় বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। তবে অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়ার কূপ খননে তেজস্ক্রিয় ‘রেডিও অ্যাকটিভ সোর্স’ ব্যবহার করেছিল বলে জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি অভিযোগ করেছে। তাদের মতে, অনভিজ্ঞতা, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
মাগুরছড়া অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে আন্দোলন এখনো চলমান। প্রতি বছর ১৪ জুন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
১৯৯৭ সালের ২০ ডিসেম্বর অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া থেকে বিদায় নেয়। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় জনগণ ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, বনের ক্ষতি নিরূপণ করা হলেও এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
এদিকে মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে আজ রোববার কমলগঞ্জে পাহাড় রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি ও কমলগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগের দাবি জানানো হবে।

