মুহাম্মদ মহসিন আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর—ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই জনপদটি এখন যেন লাল টিলার বুকে গড়ে ওঠা এক রঙিন স্বপ্নভূমি। ছোট ছোট উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার লালমাটিতে এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলে থাকা লালচে-সবুজ লিচুর থোকা যেন প্রকৃতির এক অনিন্দ্য সুন্দর সাজ, যা কৃষকের মুখে এনেছে তৃপ্তির হাসি।
স্বাদ ও মানে অনন্য হওয়ায় বিজয়নগরের লিচু বহুদিন ধরেই সমাদৃত। দেশ-বিদেশে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে অনেক আগেই। আর সেই খ্যাতির টানেই এখন প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে লিচু বাগানে ঘুরে বেড়ানো, ছবি তোলা আর টাটকা লিচুর স্বাদ নেওয়ায় পুরো এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর আগে এখানে বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের সূচনা হয়। অল্প জায়গায় বেশি লাভ এবং কম শ্রমের কারণে স্থানীয় কৃষকরা ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত টিলা ও অনাবাদি জমিকে রূপ দিয়েছেন সবুজ লিচু বাগানে। আজ সেই উদ্যোগই বদলে দিয়েছে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র।
লিচুর মৌসুমে এখানে বিক্রির একটি ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করা যায়। গাছে ফুল আসার পর প্রথম ধাপে ব্যবসায়ীরা বাগান চুক্তিতে কিনে নেন। এরপর পাকা লিচু সরাসরি বিক্রি হয় পর্যটক ও ক্রেতাদের কাছে। উপজেলার আউলিয়া বাজার ও চম্পকনগর বাজারে পুরো মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হয়। পাশাপাশি সিংগারবিল, হরষপুর বাজারে ও জমজমাট থাকে লিচুর হাট।
এসব বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীরা লিচু সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফেনী এমনকি রাজধানী ঢাকায়ও পৌঁছে যায় বিজয়নগরের লিচু।
উপজেলার পত্তন, আদমপুর, সেজামুড়া, কামালমুড়া, ছতরপুর, বক্তারমুড়া, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, কালাছড়া, মেরাশানী, হরষপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন লিচুর সমারোহ। গ্রামগুলোতে নারী, পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের পদচারণায় পুরো এলাকা রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত পর্যটন নগরীতে।
বিজয়নগরে বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় ১ হাজার ৪৫০টি লিচু বাগান রয়েছে। এর বাইরেও প্রায় প্রতিটি বাড়িতে দেখা মেলে লিচু গাছের। পাটনাই, বম্বে, চায়না থ্রি, চায়না-২ ও এলাচি জাতের লিচু এখানে বেশি চাষ হয়।
সেজামুড়ার বাগান মালিক আব্বাস উদ্দিন জানান, তার বাগানে ১২০টি গাছ রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। অন্যদিকে রফিক মিয়া আশাবাদী, তার চারটি বাগান থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হবে।
দর্শনার্থীদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস কম নয়। সৌদি আরব প্রবাসী নাজমুল চৌধুরী জীবন বলেন, “শুধু শুনেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে এসে দেখলাম—এটা সত্যিই অসাধারণ! প্রকৃতি আর লিচুর এমন মিলন খুব কমই দেখা যায়।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, এ বছর আনুমানিক ৫৪৫ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদিত বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রতি বছর লিচু আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উন্নয়নে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে চাষীদের সহায়তা অব্যাহত আছে। লিচু চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, বিজয়নগরের লাল টিলায় ফলা এই লিচু শুধু অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে না—এলাকাটিকে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরছে। কৃষি ও পর্যটনের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে বিজয়নগর এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

