রিজওয়ান, নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার মহেশপুর জুনিয়র স্কুলে (৬ষ্ঠ-৮ম, EIIN-134294) ২০২২ সালে চার শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে ২০০২ ও ২০০৪ সালের ব্যাকডেটের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং ম্যানেজিং কমিটির কাগজপত্র ব্যবহার করে অবৈধভাবে চারজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বর্তমান স্টাফ এবং সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের একাধিক বিষয়ের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি একযোগে ঘোষিত এমপিও তালিকায় স্কুলটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ওই চার শিক্ষক এমপিওভুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে সাধারণ গণিত বিষয়ের শিক্ষক আহমেদ আউয়ালের ডিগ্রি পাস কোর্সে তৃতীয় বিভাগ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন শরীরচর্চা বিষয়ের শিক্ষক সেলিম পারভেজ, কাব্যতীর্থ ডিগ্রিধারী বুলবুলি রানী এবং কৃষি ডিপ্লোমাধারী কাঞ্চন কুমার। অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের কারও এনটিআরসিএ নিবন্ধন নেই।
তাদের দাবি, ২০১১ সাল থেকে পরিচালিত অনলাইন ব্যানবেইজ জরিপ, বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্য অনুযায়ী এসব শিক্ষক ২০১৫-১৬ সালের আগে কখনও বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন না। পরবর্তীতে ব্যাকডেটের নথি ব্যবহার করে তাদের নিয়োগ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক সামসুল আলম মিলন, আব্দুল জলিল, শ্রী দিবাকর ও আলমগীর কবিরসহ সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, “আমার জানা মতে, অভিযোগে উল্লেখিত চারজন শিক্ষককে ২০১৫ সালের আগে কখনও বিদ্যালয়ে দেখিনি। তবে তাদের নিয়োগ কীভাবে হয়েছে বা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কী ঘটেছে, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। অভিযোগে উল্লেখিত চারজন শিক্ষককে আমাদের শিক্ষাজীবনের সময় কখনও বিদ্যালয়ে দেখিনি। যদি পূর্বে কর্মরত না থেকেও ব্যাকডেট ব্যবহার করে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এদিকে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ এবং অডিট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক সঞ্জয় চন্দ্র মণ্ডল সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। তিনি তদন্তের পাশাপাশি নিরীক্ষা কার্যক্রমও সম্পন্ন করেন।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করতে হবে, অন্যথায় বিরূপ প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক সঞ্জয় চন্দ্র মণ্ডল বলেন, “আমি বিদ্যালয়টিতে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ এবং অডিট—উভয় বিষয়ে তদন্ত করেছি। আমাদের নির্ধারিত কিছু ফরম্যাট ও প্রক্রিয়া রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
তদন্ত প্রভাবিত করতে অর্থ লেনদেন বা ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো বিষয়ে আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে দেখব।”
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি প্রতিবেদককে বিদ্যালয়ে এসে সরাসরি সাক্ষাৎ করে আলোচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ভাই, আসেন। সামনাসামনি কথা হবে।” তবে অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের জবাব তিনি ফোনে দিতে চাননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অযোগ্য ও অনিবন্ধিত শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ নিয়োগ বাতিল এবং এনটিআরসিএ নিবন্ধিত যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

