Bangla FM
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • কলাম
  • ভিডিও
  • অর্থনীতি
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • প্রবাস
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • মতামত
  • লাইফস্টাইল
No Result
View All Result
Bangla FM

ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় : ভাষাবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও বাঙালির জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক মহীরুহ

Bangla FM OnlinebyBangla FM Online
৭:২৫ pm ২৯, মে ২০২৬
in Semi Lead News, কলাম
A A
0

সৈয়দ আমিরুজ্জামান 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব, ধ্বনিবিজ্ঞান, তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান এবং সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসে যেসব মনীষীর নাম সর্বোচ্চ মর্যাদায় উচ্চারিত হয়, ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যসমালোচক, সংস্কৃতিবেত্তা এবং বিশ্বমানের জ্ঞানতাপস।

তাঁর পাণ্ডিত্য, গবেষণা ও বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন মর্যাদা এনে দিয়েছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসামান্য ভাষাতাত্ত্বিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘ভাষাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন পণ্ডিতকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক জ্ঞান-ঐতিহ্যকে স্মরণ করা, যা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিকে দৃঢ় করেছে। বাংলা ভাষার শিকড়, বিকাশ, ধ্বনি, ব্যাকরণ, সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্য এবং ভারতীয় ভাষাসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর যে বিস্তৃত গবেষণা, তা আজও ভাষাবিজ্ঞানের জগতে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শৈশব, সংগ্রাম ও শিক্ষাজীবনের দীপ্ত অধ্যায়

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ১৮৯০ সালের ২৬ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরিদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ইংরেজদের একটি সওদাগরি প্রতিষ্ঠানের কেরানি এবং মাতা কাত্যায়নী দেবী ছিলেন সংস্কৃতিমনা এক গৃহিণী। আর্থিক প্রাচুর্য না থাকলেও পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, কৌতূহলী এবং অধ্যয়নপ্রিয়।

তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সংগ্রামমুখর। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন। ১৯০৭ সালে মতিলাল শীল ফ্রি স্কুল থেকে এনট্রান্স পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে মাসিক কুড়ি টাকার বৃত্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে এফ.এ. পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১১ সালে বি.এ. এবং ১৯১৩ সালে ইংরেজি অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি শিক্ষাজগতে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

এরপর ১৯১৪ সালে এম.এ. সম্পন্ন করে তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। একই বছর কমলাদেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষকতা ও গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই তিনি দ্রুত নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন।

ইউরোপে ভাষাবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ

১৯১৯ সালে ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি ইউরোপে যান। এই সফর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ফোনেটিক্স বা ধ্বনিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ধ্বনিতত্ত্ব, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব, প্রাকৃত ভাষা, ফরাসি সাহিত্য, পুরাতন আইরিশ ভাষা, গোথিক ভাষা প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করেন।

শুধু লন্ডনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি প্যারিসের সারবোন বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যয়ন করেন। সেখানে ভারতীয় আর্য ভাষাতত্ত্ব, স্লাভ ভাষা, অস্ট্রো-এশীয় ভাষাতত্ত্ব, প্রাচীন মধ্য এশীয় ভাষা, গ্রিক ও লাতিন ভাষার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর এই বিস্তৃত অধ্যয়ন তাঁকে আন্তর্জাতিক মানের ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বিশ্বের বহু ভাষার ধ্বনি, গঠন ও বিবর্তন নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান তাঁকে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে তাঁর গবেষণা আজও প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বের নবযুগ

১৯২২ সালে দেশে ফিরে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের প্রথম ‘খয়রা অধ্যাপক’ হিসেবে নিয়োগ দেন। এটি ছিল ভারতীয় ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতীয় ভাষাবিজ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্ব গবেষণার এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে পরবর্তীকালে বহু ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ তৈরি হন। তিনি ভাষা নিয়ে গবেষণাকে শুধু ব্যাকরণ বা সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং ভাষাকে ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও নৃতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছেন।

বাংলা ভাষার ধ্বনি-বিন্যাস, শব্দগঠন, উপভাষা, উচ্চারণভেদ এবং ভাষার সামাজিক রূপান্তর নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও বিস্ময় জাগায়। তাঁর গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি।

রবীন্দ্রনাথ ও সুনীতি কুমার : জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘ভাষাচার্য’ উপাধি প্রদান করেন। এটি কেবল একটি সম্মানসূচক উপাধি ছিল না; বরং বাংলা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞানে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতি।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শব্দতত্ত্ব’ গ্রন্থটি সুনীতি কুমারকে উৎসর্গ করেছিলেন। এই ঘটনা দুই মনীষীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বৌদ্ধিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে।

১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুনীতি কুমার সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিয়ো ও শ্যামদেশ সফর করেন। সেখানে তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সভ্যতা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। এই সফরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি ‘দীপময় ভারত’ গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়।

ভাষাবিজ্ঞান গবেষণায় অসামান্য অবদান

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার বিস্তৃতি ছিল বিস্ময়কর। বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, উপভাষা, ব্যাকরণ, শব্দতত্ত্ব এবং ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর বিকাশ নিয়ে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা’। এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ, ধ্বনিগত পরিবর্তন ও ব্যাকরণগত বিবর্তন নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থ এখনো অপরিহার্য।

‘Bengali Phonetic Reader’ গ্রন্থে তিনি বাংলা ভাষার ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞান চর্চায় এই কাজ পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে।

তাঁর ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ গ্রন্থে ভারতবর্ষের ভাষাগত বৈচিত্র্য, রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক, ভাষা-রাজনীতি ও জাতীয় সংহতির প্রশ্ন নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় উপমহাদেশে ভাষা-প্রশ্ন যে কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তাঁর লেখায় তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি ভাষাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; ভাষাকে তিনি একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার প্রশ্নে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।

বিশ্বপরিসরে এক বাঙালি পণ্ডিত

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন প্রকৃত অর্থেই বিশ্বনাগরিক। ভাষাতত্ত্ব, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং বিশ্বজুড়ে সম্মান লাভ করেন।

১৯৩৬ সালে তিনি রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে তিনি ‘ব্রেইল অক্ষর’ কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। হল্যান্ডের সোসাইটি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স, নরওয়েজিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা লাভ করেন।

চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে তিনি ভাষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিষয়ে বক্তৃতা দেন। তাঁর জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও বিশ্লেষণক্ষমতা বিদেশি পণ্ডিতদেরও মুগ্ধ করেছিল।

তিনি ভারত-সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব ও মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চা

সুনীতি কুমার শুধু ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন না; বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি চণ্ডীদাসের পদাবলির প্রামাণ্য সংস্করণ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জয়দেব, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রসাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি গভীর গবেষণা করেছেন।

তাঁর ‘World Literature and Tagore’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে কখনো সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি; বরং বিশ্বমানবতার আলোকে বিচার করেছেন।

সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা ও সংস্কৃতি মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, সহাবস্থান ও সভ্যতার বিকাশে মৌলিক ভূমিকা পালন করে।

রাষ্ট্র, সমাজ ও ভাষা-রাজনীতি নিয়ে তাঁর ভাবনা

ভাষা প্রশ্নে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি ভাষাগত বৈচিত্র্যকে ভারতের শক্তি হিসেবে দেখতেন। রাষ্ট্রভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতার পরিবর্তে তিনি বহুভাষিক সহাবস্থানের পক্ষে মত দেন।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যখন বহু ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে, তখন সুনীতি কুমারের চিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মাতৃভাষার বিকাশ, স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর ভাবনা আজও দিকনির্দেশনামূলক।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিবেচনায় আনলেও তাঁর গবেষণা ও ভাষাবিষয়ক দর্শনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি জাতিসত্তা, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক—এই উপলব্ধি তাঁর লেখায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় জীবদ্দশায় বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৬ সালে তাঁকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়।

১৯৬৯ সালে তিনি সাহিত্য একাডেমির সভাপতি নির্বাচিত হন। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে।

তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩৮০। এই বিপুল কর্মভাণ্ডার তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষীতে পরিণত করেছে।

জ্ঞানপিপাসু এক আজীবন শিক্ষার্থী

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নিরন্তর জ্ঞানসন্ধান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা, গবেষণা ও চিন্তাচর্চা চালিয়ে গেছেন। ভাষাবিজ্ঞান ছাড়াও সংগীত, চিত্রকলা, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও দর্শনের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কোনো শেষ নেই। তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি জ্ঞানকে ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, মানবসভ্যতার অগ্রগতির জন্য ব্যবহার করেছেন।

আজকের প্রেক্ষাপটে সুনীতি কুমারের প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান সময়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা নানা ধরনের সংকটের মুখোমুখি। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে মাতৃভাষার চর্চা কমে যাচ্ছে, গবেষণার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে এবং সংস্কৃতির বহুত্ববাদ আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম আমাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করে।

তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা নিয়ে গবেষণা মানে শুধু শব্দ বিশ্লেষণ নয়; বরং মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা ও সভ্যতার গতিপথকে বোঝা। ভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির স্মৃতি, মনন ও আত্মপরিচয়।

তাঁর গবেষণা নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও জ্ঞান-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। একইসঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে মুক্তবুদ্ধির চর্চারও শিক্ষা দেয়।

ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়কে নিবেদিত এবং তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“ভাষাচার্য”

হাওড়ার শিবপুরে শীতের ভোরবেলা, কুয়াশা মেখে আসে গঙ্গার নীল ঢেউ, দরিদ্র সংসারে আলো জ্বেলে দিয়ে একটি শিশু যেন জেগে উঠল নীরবে, নক্ষত্রের মতো দীপ্ত কপাল নিয়ে, চোখে তার ভবিষ্যৎ শত ভাষার রৌদ্র।

মাতার কোল জুড়ে কাত্যায়নীর স্নেহ, পিতার ক্লান্ত মুখে অন্নহীন দিন, ইংরেজ সওদাগর দপ্তরের কেরানি হরিদাস ফিরতেন সন্ধ্যার অন্ধকারে, তবু সেই ঘরজুড়ে ক্ষুধার চেয়ে বড় বইয়ের প্রতি ছিল অনন্ত আকর্ষণ।

বাতির ক্ষীণ আলো কাঁপিত রাতভর, খাতার পাতায় ঘুম ঝরত অবিরাম, তবু শিশু সুনীতি থামেনি কখনো, শব্দের শরীরে শুনেছে পৃথিবী, ধ্বনির ভেতরকার গুপ্ত ইতিহাস, বর্ণমালার মাঝে সভ্যতার যাত্রা।

মতিলাল শীলের সেই বিদ্যালয়ে দুঃসহ সংগ্রামের দিন গিয়েছে কেটে, এনট্রান্স পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান পেয়ে বৃত্তির কুড়ি টাকা এল আশীর্বাদ, সেই অর্থ মানে ছিল শুধু অর্থ নয়, জ্ঞানার্জনের পথে নতুন এক প্রদীপ।

স্কটিশচার্চ কলেজ জানে তার অধ্যবসায়, প্রেসিডেন্সির পথে মেধার দীপ্তি জ্বলে, ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণি পেয়ে তিনি দেখালেন জ্ঞানের কোনো সীমানা মানচিত্রের মতো বেঁধে রাখা যায় না, প্রতিটি ভাষাই এক সমুদ্রের দিগন্ত।

কলকাতার পথে ঘোড়ার গাড়ির শব্দ, বইয়ের দোকানে ঝুলে থাকে স্বপ্ন, বইয়ের পাতাতে তিনি খুঁজে ফিরেছেন মানবজাতির দীর্ঘ স্মৃতির ইতিহাস, কীভাবে ধ্বনি বদলায় শতাব্দী জুড়ে, কীভাবে শব্দেরা গড়ে তোলে জাতি।

বিদ্যাসাগর কলেজ তাঁকে ডাকল পরে, ইংরেজি ভাষার নবীন অধ্যাপক, যে মানুষ শব্দকে দেখতেন জীবন্ত, তার কণ্ঠে পাঠ ছিল নদীর মতো স্বচ্ছ, ছাত্রেরা শুনিত বিস্মিত দৃষ্টিতে, ভাষার ভিতরে কত রৌদ্র, কত রাত্রি।

কমলাদেবীর সঙ্গে জীবনের বন্ধন, সংসারের আঙিনায় স্নিগ্ধতার আলো, তবু গবেষণার অমিত অন্বেষণ তাঁকে ছুটিয়ে নেয় আরো দূর দেশে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে রাত্রি জেগে জেগে লিখেছেন ভাষাতত্ত্ব।

সংস্কৃত ব্যাকরণ, প্রাকৃতের ধ্বনি, ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দের বংশধারা, পাণ্ডুলিপির গায়ে প্রাচীন সভ্যতা, শিলালিপির মাঝে হারানো মানুষের নীরব উচ্চারণ শুনেছেন মন দিয়ে, যেন মৃত ভাষাও জেগে ওঠে আবার।

তারপর একদিন সমুদ্রযাত্রা, ইউরোপের পথে তরুণ গবেষক, ধ্বনিতত্ত্ব শেখার রাষ্ট্রীয় বৃত্তি, লন্ডনের আকাশে কুয়াশার নগর, অজস্র ভাষার মধ্যে তিনি খুঁজেছেন মানুষের মিলনের গভীরতম সূত্র।

ফোনেটিক্সের কক্ষে নিখুঁত উচ্চারণ, ঠোঁটের সূক্ষ্ম ভঙ্গি, জিহ্বার আন্দোলন, শব্দ কেবল শব্দ নয়—শরীরের সুর, নিঃশ্বাসের ভেতরে ইতিহাসের রেখা, তিনি শিখলেন যেন বায়ুরও ব্যাকরণ, নীরবতারও আছে উচ্চারণভঙ্গি।

সারবোন বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছে তাঁকে, প্রাচীন গ্রিক ভাষা, লাতিনের ধারা, স্লাভ জাতির বুকে শব্দের অভিযাত্রা, অস্ট্রো-এশীয় ধ্বনি, খোটানি স্মৃতি, পৃথিবীর ভাষারা এক বৃক্ষের শাখা, তিনি তার শিকড়ে নেমেছেন নির্ভয়ে।

দেশে ফিরে এলে আশুতোষ ডাকেন, খয়রা অধ্যাপকের আসনে বসান, ভারতীয় ভাষার প্রথম মহাগুরু, তিন দশক জুড়ে অধ্যাপনার দীপ, কলকাতা তখন জ্ঞানের মহাসভা, তাঁর কক্ষে প্রতিদিন ভাষার উৎসব।

বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা লিখে তিনি যেন খুললেন নবীন জানালা, বাংলা কেবল নদী, মাটি, কাব্য নয়, বাংলা এক দীর্ঘ বিবর্তনের ফল, অসংখ্য জাতির ধ্বনি এসে মিশেছে এই ভাষার বুকে পদ্মার স্রোতের মতো।

বাঙালির মুখের সাধারণ উচ্চারণ, গ্রামের লোকভাষা, শহরের পরিবর্তন, তিনি সব শুনেছেন সমান মমতায়, কারণ তাঁর কাছে ভাষা মানে মানুষ, শুধু অভিধান নয়, কেবল ব্যাকরণ নয়, মানুষের অশ্রু আর আনন্দের সুর।

রবীন্দ্রনাথ তখন বিশ্বকবির আসনে, দুই মহামানবের দীপ্ত সাক্ষাৎকার, শব্দতত্ত্ব গ্রন্থ কবিগুরু দিলেন সস্নেহ উৎসর্গ ভাষাপ্রেমী জনে, আর একদিন দিলেন ‘ভাষাচার্য’ নাম, বাংলা জ্ঞানের আকাশ উজ্জ্বল হলো।

কবিগুরুর সাথে সুমাত্রার দ্বীপে, জাভার অরণ্যে, বোর্নিয়োর নদীতে, শ্যামদেশের পথে সংস্কৃতির আলো, ভারতের শিল্প আর সাহিত্যের বাণী, সুনীতির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে দূরে, সমুদ্র পেরিয়ে জেগেছে নতুন সেতু।

‘দীপময় ভারত’ শুধু ভ্রমণগাথা নয়, সভ্যতার বিস্তৃত মানচিত্র সেখানে, দ্বীপের মানুষ আর ভারতীয় চেতনা কীভাবে জড়িয়েছে ইতিহাস জুড়ে, তিনি লিখেছেন তা নিবিড় অনুসন্ধানে, জ্ঞানের প্রতিটি পাতা দীপ্ত নক্ষত্র।

লন্ডনের সম্মেলন, ইউরোপের পথ, লোকগাথা সংগ্রহ, ধ্বনিবিজ্ঞানের সভা, তিনি শুনেছেন জনপদের প্রাচীন গান, মেষপালকের সুর, কৃষকের উপাখ্যান, কারণ ভাষার ভেতর বেঁচে থাকে মানুষ, লোককথা মানেই ইতিহাসের শ্বাস।

রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মান, বিশ্বজোড়া পণ্ডিত সমাজের স্বীকৃতি, তবু তাঁর আচরণ ছিল বিনয়ী, জ্ঞান যেন বৃক্ষের ফলভরা ডাল, যত বেশি সমৃদ্ধ তত বেশি নত, সুনীতি ছিলেন তেমনই মহীরুহ।

করাচির সভায় হিন্দি সাহিত্য, এলাহাবাদের সম্মান ‘সাহিত্য বাচস্পতি’, বহুভাষার মাঝে তিনি খুঁজে নিলেন মানুষে মানুষে মিলনের সম্ভাবনা, ভাষা নিয়ে যেন বিভেদের রাজনীতি কখনো না ঢাকে মানবতার সূর্য।

ইউনেস্কোর ডাকে প্যারিসের পথে, ব্রেইল অক্ষরের আলো নিয়ে ভাবনা, অন্ধ মানুষেরও জ্ঞানের অধিকার, অক্ষরের স্পর্শে খুলুক বিশ্বদ্বার, এমন মানবিক দৃষ্টিতে তিনি বিদ্যার মানচিত্র প্রসারিত করেছেন।

হল্যান্ড, অসলো, সোভিয়েত ভূমি, চীন থেকে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার পথ, ভাষাবিদ, পণ্ডিত, রাষ্ট্রনায়কেরা তাঁর জ্ঞানের সামনে মুগ্ধ বিস্ময়ে, কিন্তু তিনি ছিলেন চির শিক্ষার্থী, প্রতিটি সফরে নতুন জ্ঞান আহরণ।

স্লাভ জাতির ইতিহাস বলিতে গিয়ে তিনি যেন খুলেছেন প্রাচীন জানালা, বাল্টিক উপকূলের মানুষের স্মৃতি, আর্মেনিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক, সভ্যতার নীরব সেতুবন্ধনগুলো তাঁর গবেষণায় পেয়েছে নতুন ভাষা।

পশ্চিমবঙ্গ পরিষদের গুরুদায়িত্ব, দীর্ঘ ষোল বছর নেতৃত্বের পথ, রাষ্ট্রের পরিসর, শিক্ষার ভবিষ্যৎ, সংস্কৃতির প্রশ্নে দৃঢ় উচ্চারণ, জ্ঞানচর্চা ছাড়া জাতির মুক্তি নেই— এ সত্য তিনি বারবার উচ্চারিত।

পদ্মবিভূষণের গৌরব এল শেষে, জাতীয় অধ্যাপক সম্মানের আলো, কিন্তু পদক নয়, সম্মান নয় কেবল, তাঁর প্রকৃত পরিচয় অনুসন্ধান, যে মানুষ ভাষাকে দেখেছে জীবন্ত, মানুষের বিবর্তনের দীর্ঘ নদী।

চণ্ডীদাসের পদাবলি সম্পাদনায় মধ্যযুগীয় প্রেম পেল নব আলো, জয়দেবের কাব্য বিশ্বদরবারে, রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে স্থাপন করেছেন গভীর বিশ্লেষণে, বাংলা সাহিত্য পেল নতুন মর্যাদা।

তাঁর কলম ছিল জ্ঞানের দীপশিখা, তিনশো আশিটি গ্রন্থের মহাসমুদ্র, প্রতিটি বই যেন গবেষণার ক্ষেত্র, শব্দের ভেতরকার গোপন জীবাশ্ম, সভ্যতার পথে মানুষের অভিযাত্রা, সময়ের বুকে রেখে গেছে আলোক।

বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় তিনি চেয়েছেন সরল প্রকাশভঙ্গি, ভাষা যেন মানুষের কাছেই থাকে, শুধু পণ্ডিতদের অট্টালিকায় নয়, গ্রামের কৃষকও নিজের ভাষাকে স্নেহভরে চিনুক আত্মার আয়নায়।

ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা, আজও প্রাসঙ্গিক দীপ্ত বিশ্লেষণ, ভাষাভিত্তিক অহংকারের আগুন জাতিকে কতবার বিভক্ত করেছে, তবু বহুভাষিক মিলনের সংস্কৃতি ভারতবর্ষের প্রাণ—বলেছেন তিনি।

তিনি জানতেন ভাষা নদীর মতো, স্থির থাকলে তার মৃত্যু অবধারিত, শব্দ বদলাবে, উচ্চারণ বদলাবে, মানুষের জীবন যেমন রূপান্তরিত, এই পরিবর্তনের ভেতরেই লুকায় ভাষার সত্যিকার জীবনীশক্তি।

গান, চিত্রকলা, সভ্যতার ইতিহাস, সবকিছুর প্রতি তাঁর অনুসন্ধান, একটি মানুষের ভেতর কত শত জ্ঞানতৃষ্ণা জেগে থাকতে পারে, তিনি তার অনন্য মহৎ উদাহরণ, প্রজ্ঞার আকাশে জ্বলন্ত ধ্রুবতারা।

শেষ জীবনে যখন বিতর্ক উঠিল, রামায়ণের উৎস নিয়ে মতভেদ, তবু তিনি থামেননি সত্যের অনুসন্ধান, কারণ গবেষকের একমাত্র দায়িত্ব প্রশ্নের গভীরে অবিরত যাত্রা, জনমতের ভয়ে নত হওয়া নয়।

ঊনিশ শতকের শেষে জন্ম নেওয়া সে মানুষ দেখেছে শতাব্দীর রূপ, উপনিবেশ, স্বাধীনতা, যুদ্ধের ধ্বনি, সভ্যতার ভাঙন, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, তবু তাঁর বিশ্বাস ছিল জ্ঞানের শক্তি, ভাষাই মানুষকে কাছাকাছি আনে।

আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব কক্ষে, ধুলোমাখা গ্রন্থাগারের তাক জুড়ে, তাঁর বই খুলিলে জেগে ওঠে যেন এক মহাদেশের ইতিহাস একসাথে, বাংলা থেকে গ্রিক, সংস্কৃত থেকে স্লাভ, সব ভাষা মিলে মানবতার গান।

আজকের তরুণ যদি প্রশ্ন তোলে, কীভাবে হতে হয় সত্যিকারের পণ্ডিত, তবে সুনীতির জীবন সামনে ধরো, দারিদ্র্যকে জয় করে নিরলস অধ্যয়ন, নম্রতার সঙ্গে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ।

যে দেশে বিদ্যার আলো ক্ষীণ হয়ে যায়, যে সমাজ ভুলে যায় গবেষণার মূল্য, সে সমাজ ধীরে অন্ধকারে নামে, সুনীতি কুমার তাই আজও প্রয়োজন, ভাষাচার্যের দীপ্ত অনুশাসন এখনো প্রাসঙ্গিক প্রতিটি প্রজন্মে।

শুধু ভাষাবিদ নন, তিনি এক সেতু, পূর্ব আর পশ্চিম, অতীত আর বর্তমান, লোকভাষা থেকে বিশ্বসাহিত্যের পথ, সবখানে তিনি নির্মাণ করেছেন বোধের এক বিশাল মানবিক ভূগোল, যেখানে বিভেদ নয়, মিলনের আহ্বান।

হে ভাষাচার্য, আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়, শব্দের ভেতরে তুমি রেখে গেছ মানুষকে জানার দুর্লভ পদ্ধতি, ভাষা যে আত্মারও ইতিহাস বহন করে, তোমার জীবন তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

তোমার কলমে ছিল সময়ের মানচিত্র, তোমার উচ্চারণে সভ্যতার সুর, তোমার গবেষণায় প্রাচীন পৃথিবী নতুন আলোর মতো জেগেছে পুনরায়, তুমি না থাকিলে বাংলা ভাষাতত্ত্ব এত বিস্তৃত মহিমা পেত কি কখনো?

আজকের ডিজিটাল বিভ্রান্ত পৃথিবী, ক্ষুদ্র বাক্য, দ্রুত বিস্মৃতির যুগ, সেখানে তোমার ধৈর্যশীল অধ্যয়ন পর্বতের মতো দৃঢ় অনুপ্রেরণা, জ্ঞান মানে শ্রম, তপস্যা, অনুসন্ধান, এই সত্য তুমি জীবনে লিখেছ।

গঙ্গার বাতাসে আজও ভেসে আসে শিবপুরের সেই প্রাচীন সকাল, এক দরিদ্র ঘরে জন্মানো শিশুটি বিশ্বসভায় আজও দীপ্তিমান, কারণ সত্যিকারের জ্ঞানের আলো মৃত্যুর অন্ধকার মানে না কখনো।

বাংলার মাটি আজ কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, ভারতবর্ষও নত প্রজ্ঞার সামনে, বিশ্বের বিদ্বজ্জন শ্রদ্ধায় স্মরণ করে ভাষার মহামুনি সুনীতি কুমার, তোমার রেখে যাওয়া আলোকশিখা অম্লান থাকবে শত শত বছর।

যতদিন মানুষ শব্দ উচ্চারণ করবে, মায়ের ভাষাতে ডাকবে আপনজন, যতদিন শিশুরা প্রথম বর্ণ শেখে, যতদিন কবিরা রচনা করবে গান, ততদিন ভাষাচার্য তোমার নাম জ্ঞানীর দীপ হয়ে জ্বলবে নিরবধি।

তোমার স্মৃতির প্রতি প্রণাম জানাই, হে ধ্বনির সাধক, হে শব্দের ঋষি, মানুষের ভাষায় মানুষকে চিনিবার যে মহান শিক্ষা তুমি দিয়ে গেছ, তা হোক আগামী দিনের পাথেয়, সভ্যতার পথে আলোকিত দিশা।
—(ভাষাচার্য,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

উপসংহার

ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তিনি ভাষাকে জ্ঞানের, সংস্কৃতির এবং মানবিক সংহতির সেতুবন্ধন হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা মানে বাঙালির জ্ঞান-ঐতিহ্য, ভাষাপ্রীতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করা। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তবে ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ হবে।

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় কেবল অতীতের একজন পণ্ডিত নন; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও এক প্রেরণার নাম। বাংলা ভাষা ও বিশ্বমানবতার সেবায় তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

ShareTweetPin

সর্বশেষ সংবাদ

  • বাগমারায় মবের কবলে মাছ ব্যবসায়ী
  • শ্যামনগরে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে শিশুর মৃত্যু
  • ঝালকা‌ঠির নলছিটিতে হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার
  • চু্য়াডাঙ্গায় বিনোদন কেন্দ্রগুলো উপচে পড়া ভিড়
  • ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় : ভাষাবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও বাঙালির জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক মহীরুহ

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম
নির্বাহী সম্পাদক: মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ

বাংলা এফ এম , বাসা-১৬৪/১, রাস্তা-৩, মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ

ফোন:  +৮৮ ০১৯১৩-৪০৯৬১৬
ইমেইল: banglafm@bangla.fm

  • Disclaimer
  • Privacy
  • Advertisement
  • Contact us

© ২০২৬ বাংলা এফ এম

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • প্রবাস
  • ভিডিও
  • কলাম
  • অর্থনীতি
  • লাইফস্টাইল
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • চাকুরি
  • অপরাধ
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • ফটোগ্যালারি
  • ফিচার
  • মতামত
  • শিল্প-সাহিত্য
  • সম্পাদকীয়

© ২০২৬ বাংলা এফ এম