সত্যজিৎ দাস:
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও জনজীবনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব সুনীল দত্তের আজ ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। অভিনয়,চলচ্চিত্র নির্মাণ,সমাজসেবা ও রাজনীতিতে অসামান্য অবদানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে কেবল একজন তারকা নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর প্রয়াণের দুই দশক পরও স্মৃতি ও কর্মে তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
১৯২৯ সালের ৬ জুন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝিলম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সুনীল দত্ত। তাঁর আসল নাম ছিল বলরাজ দত্ত। দেশভাগের অস্থির সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকার মধ্যে এক মুসলিম বন্ধুর সহায়তায় তাঁর পরিবার প্রাণে রক্ষা পেয়ে ভারতে চলে আসে। জীবনের সেই কঠিন অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তি গড়ে দেয়।
চলচ্চিত্রে পা রাখার আগে তিনি ‘রেডিও সিলন’-এর জনপ্রিয় ঘোষক হিসেবে কাজ করতেন। গভীর ও আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বরের কারণে খুব অল্প সময়েই শ্রোতাদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৫৫ সালে ‘রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও ১৯৫৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ তাঁকে এনে দেয় দেশজোড়া খ্যাতি। ছবিতে তাঁর সংযত ও শক্তিশালী অভিনয় দর্শক এবং সমালোচকদের সমানভাবে মুগ্ধ করে।
‘মাদার ইন্ডিয়া’ শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি,ব্যক্তিজীবনেও এনেছিল নতুন অধ্যায়। শুটিং চলাকালে আগুন লাগলে সহশিল্পী নার্গিসকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেন তিনি। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই গড়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক,যা পরবর্তীতে বিবাহবন্ধনে রূপ নেয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই দম্পতি ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয়।
অভিনেতা হিসেবে সুনীল দত্ত ছিলেন বহুমাত্রিক ও স্বতন্ত্র। সামাজিক,মানবিক ও আবেগঘন চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মাদার ইন্ডিয়া’ (১৯৫৭), ‘সুজাতা’ (১৯৫৯), ‘মুঝে জিনে দো’ (১৯৬৩), ‘ওয়াক্ত’, ‘পড়োসন’ এবং ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ (২০০৩)। দীর্ঘ বিরতির পর ছেলে সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’-এ তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের জন্য ছিল আবেগময় এক পুনর্মিলন।
অভিনেতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহসী ও পরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯৬৪ সালে পরিচালিত ‘ইয়াদে’ চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়,কারণ পুরো ছবিতে একমাত্র অভিনেতা ছিলেন স্বয়ং সুনীল দত্ত। এই অভিনব নির্মাণ তাঁকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও স্থান এনে দেয়।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গভীর ও আন্তরিক। ১৯৮১ সালে স্ত্রী নার্গিস ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নার্গিস দত্ত মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’। ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা ও সহায়তায় এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও শ্রদ্ধার আসনে পৌঁছে দেয়।
১৯৮৪ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং মুম্বাই উত্তর-পশ্চিম আসন থেকে পাঁচবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি শান্তি,সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। মুম্বাই দাঙ্গার সময় তিনি রাজপথে নেমে শান্তির বার্তা ছড়িয়েছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও দায়িত্ববান। নানা সংকট ও বিতর্কের সময় ছেলে সঞ্জয় দত্তের পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থেকে একজন পিতা হিসেবে বিরল উদাহরণ স্থাপন করেন। এ কারণেই তাঁকে অনেকেই স্নেহভরে ডাকতেন ‘জেন্টল জায়ান্ট’ নামে।
২০০৫ সালের ২৫ মে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুনীল দত্ত। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্র ও জনজীবনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করলেও তাঁর আদর্শ, মানবিকতা ও কর্মনিষ্ঠা আজও অগণিত মানুষের প্রেরণা হয়ে আছে।

