হায়দার আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আস্তার রহমান (চৌডালা সেতু) এলাকায় এক প্রতিবন্ধী স্কুটিচালকের কাছ থেকে টোল আদায়ের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই ঘটনার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস, যা শুধু একজন মানুষের কষ্ট নয়, বরং একটি অসহায় পরিবারের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
ভুক্তভোগী জানান, ২০১০ সালের ১৩ মার্চ তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে তিনি এক বড় ভাইয়ের বাইসাইকেলের পেছনে বসে ফার্মেসির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস বেপরোয়া গতিতে রং সাইডে এসে ধাক্কা দেয়। বাসটি প্রথমে একটি নিম গাছে আঘাত করে এবং পরে তিনি বাসের নিচে পড়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। সেই থেকে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না।
তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার পর উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছি। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে চিকিৎসা করাতে পারিনি। পরে কিছু জমি বিক্রি করা হয় এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ বছর পর ভারতে চিকিৎসার জন্য যেতে পেরেছিলাম।”
জানা যায়, তার বাবাও সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারান। ১৯৯৮ সালে তিনি মহিপুর এলাকার একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়াতে যাওয়ার পথে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ফতেপুর এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস রং সাইডে এসে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে আসে চরম দুর্দশা। সেই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০১০ সালের দুর্ঘটনায় পরিবারের আরেকটি স্বপ্ন ভেঙে যায়। বর্তমানে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কঠিন জীবন পার করছেন ওই যুবক।
এরই মধ্যে সম্প্রতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আস্তার রহমান (চৌডালা সেতু) পার হওয়ার সময় তার কাছ থেকে টোল আদায়ের ঘটনাটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী জানান, প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার স্কুটিগাড়ি নিয়ে ওই সেতু ব্যবহার করছেন। এর আগে কখনো তার কাছ থেকে কোনো টোল নেওয়া হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি ভাগিনাকে নিয়ে চৌডালা হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে সেতুর টোল ঘরে তাকে আটকে টাকা দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, “আমি জানতে চেয়েছিলাম প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো আলাদা নিয়ম আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আমাকে দেখাতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা বলে, গাড়ি পার হয়েছে তাই টাকা দিতেই হবে।”
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে টাকা ছাড়া যেতে দেওয়ার অনুরোধ করলেও টোল আদায়কারী ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত টাকা ছাড়া তাকে যেতে দেননি। পরে বাধ্য হয়ে তিনি টাকা পরিশোধ করে বাড়ি ফিরে যান।
ঘটনার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকার পরিমাণ বড় বিষয় নয়। কিন্তু একজন অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সামান্য মানবিকতা না দেখানো খুব কষ্টের। আমরা দয়া চাই না, সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রতিবন্ধীদের জন্য শুধু ভাতা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সুযোগ-সুবিধা, সহজ চলাচল ব্যবস্থা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সড়কে বেপরোয়া যান চলাচল ও রং সাইডে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

