পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই দেশের কোনো কোনো খামারির মধ্যে কোরবানির পশুকে মানুষের নাম ধরে ডাকার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। তারা বড় আকৃতির বা আকর্ষণীয় গরু-মহিষ বা ছাগলের নাম রাখেন সমাজের বা বিশ্বের বিভিন্ন পরিচিত মানুষের নামে। কেউ পরম আদরে এই নাম রাখেন, আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া, কাটতি বাড়ানো কিংবা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে কটাক্ষ ও হাস্যরসের পাত্র বানাতে এই কৌশল বেছে নেন।
এবারের কোরবানির হাটেও বেশ কিছু পশুর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, নরেন্দ্র মোদি কিংবা ফুটবল তারকা মেসি বা নেইমারের নামে রাখা হয়েছে। এমনকি দেশের জনপ্রিয় নায়কদের নামেও পশুর নামকরণ করার নজির দেখা যায়। প্রশ্ন হলো—পবিত্র ইবাদত কোরবানির সাথে জড়িয়ে এমন আচরণকে ইসলাম কীভাবে দেখে?
ইসলামে কোরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ আর্থিক ও কায়িক ইবাদত। এর একমাত্র মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অর্জন করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
“তোমাদের কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
যেহেতু এটি একটি পবিত্র ইবাদত, তাই কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে তার লালন-পালন ও জবাই—প্রতিটি আচরণেই সর্বোচ্চ শালীনতা, গাম্ভীর্য এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি।
শত্রু, অপছন্দের ব্যক্তি, আলোচিত কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্বকে ব্যঙ্গ কিংবা হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তাঁর নামে পশুর নামকরণ করা স্পষ্টত সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে মোটেও সমর্থন করে না। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
“মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬২৭)
কাউকে উপহাস বা অবমাননা করার উদ্দেশ্যে পশুর সাথে তাঁর নামের তুলনা করা ব্যক্তির অধিকার (হক্বুল ইবাদ) লঙ্ঘনের শামিল, যা ইসলামের সৌন্দর্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
মানুষ যেমন নিজের পোষা বা পালিত প্রাণীর পরিচয়ের জন্য কোনো নাম ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি কোরবানির পশুকে চেনার জন্যও নাম দেওয়া যেতে পারে। তবে সেই নাম কোনো মানুষের নামে হওয়া যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বেশ কিছু প্রিয় বাহন ও গৃহপালিত পশু ছিল এবং তিনি সেগুলোকে নির্দিষ্ট নামে ডাকতেন। তবে তাঁর কোনো পশুর নামই মানুষের নামে ছিল না।
ঘোড়ার নাম: তাঁর সাতটি ঘোড়া ছিল এবং প্রত্যেকটির আলাদা নাম ছিল—সাকবু (কালো ও কপালচিতা), মুরতাযিজ, লুহাইফ, লেজাজ, জারিব, সাবহাহ এবং ওয়ার্দ।
তাঁর তিনটি খচ্চর ছিল। যেমন—দুলদুল (মিসরের রাজা মুকাউকিস কর্তৃক উপহার দেওয়া সাদা-কালো ডোরাকাটা খচ্চর) এবং ফাজ্জাহ (সাদা রঙের খচ্চর)। তাঁর দুটি গাধা ছিল, যার একটির নাম ছিল ‘ইয়াফুর’ বা ‘উফাায়ের’।
বারিধারা জামে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারের খতিব এবং জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মাসউদ আহমাদ এ বিষয়ে বলেন,
“আমাদের দেশে কোরবানি এলেই মানুষের নামে পশুর নাম রাখার খবর পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিড়াল বা কুকুরকেও কেউ কেউ মানুষের নাম ধরে ডাকেন। মানুষের নামে কোনো পশুর নাম রাখা যাবে না। এতে মানুষের নামের অবমাননা ও বিকৃতি হয়। ইসলামে মানুষের নামে পশুর নাম রাখা একেবারেই নিষেধ।”
তিনি আরও জানান, পশুকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য বা ডাকার প্রয়োজনে কোনো মানুষের নাম ব্যবহার না করে বরং পশুর গায়ের রঙ বা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ‘লাল, সাদা, কালো বা বাহাদুর’ ইত্যাদি নামে ডাকা যেতে পারে।
একই বিষয়ে রাজধানীর মগবাজার রেলগেট দিলু ব্যাপারী ওয়াক্ফ এস্টেট জামে মসজিদের খতিব মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী বলেন,
“আল্লাহর কাছে আদম সন্তান বা মানুষের মর্যাদা সব সৃষ্টির ওপরে। আল্লাহ মানুষকে বড় আদর করে সৃষ্টি করেছেন এবং শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাই মানুষের নামে পশুর নাম রাখা মোটেও উচিত নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। মানুষের নামকে পশুর সাথে মিলিয়ে বিকৃত করাকে আল্লাহ হারাম করেছেন এবং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”
তাই পবিত্র কোরবানির মাহাত্ম্য ও গাম্ভীর্য ধরে রাখতে এবং মানবজাতির পারস্পরিক সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে এ ধরনের অনৈসলামিক ও অশোভন সংস্কৃতি থেকে খামারি ও সাধারণ ক্রেতা—সবারই বিরত থাকা উচিত।

