পবিত্র ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান ও তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি। এটি মূলত ত্যাগ, আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য প্রতীক। তবে বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা আর্থিক সংকটে থাকা অনেক মুসলমানের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—ঋণ বা কর্জ করে কোরবানি দেওয়া ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ কি না।
ইসলামি আইন ও শরিয়তের আলোকে এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হলো:
কোরবানির নেসাব ও কার ওপর ওয়াজিব?
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ (কোরবানির দিনগুলোতে) কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার ওপর কোরবানি আবশ্যক।

সাধারণ নিয়মে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই তাকে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বলা হয়।
যাদের এই পরিমাণ সামর্থ্য নেই, তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। ফলে তাদের জোর করে বা কষ্ট করে ঋণ নিয়ে কোরবানি করার কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলামে দেওয়া হয়নি।
যাদের কোরবানির সময় নগদ অর্থ নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে তা পরিশোধের নিশ্চিত উপায় বা সক্ষমতা রয়েছে, তারা ঋণ নিয়ে কোরবানি দিতে পারবেন। বিশ্বখ্যাত ইসলামি স্কলার ও গবেষকদের মতামত নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রখ্যাত এই ইসলামি স্কলারের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধে সক্ষম হন, তবে কোরবানির মতো ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ নেওয়া ভালো। তবে মনে রাখতে হবে, এটি তার ওপর কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। (মাজমু ফতোয়া, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ৩০৫)
সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের উপযুক্ত সামর্থ্য ও উৎস থাকলে ঋণ নিয়ে কোরবানি করায় শরিয়তের কোনো বাধা বা সমস্যা নেই। (ফতোয়া বিন বাজ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৭)
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, একজন ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক (যেমন: জমি বা সোনা আছে) কিন্তু কোরবানির দিনগুলোতে তার কাছে পর্যাপ্ত নগদ টাকা নেই, এমন অবস্থায় তিনি ঋণ করে কোরবানি দিতে পারবেন। তবে অবশ্যই ঋণটি দ্রুত পরিশোধ করার মানসিকতা এবং সৎ নিয়ত থাকতে হবে।
ইসলামে কোরবানির মূল আত্মাই হলো আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি)। এটি কোনো সামাজিক বাহাদুরি, প্রতিযোগিতা বা লোক দেখানোর বিষয় নয়।
এই বিষয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন: “আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আন-আম)
পবিত্র কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে: “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত এবং রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ, আয়াত: ৩৭)
ঋণ নিয়ে কোরবানি করা শরিয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ, তবে তা পুরোপুরি নির্ভর করবে ওই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আর্থিক স্বচ্ছলতা ও ঋণ পরিশোধের নিশ্চিত যোগ্যতার ওপর। সুদের ওপর বা পরিশোধের উপায় না জেনে অন্ধের মতো ঋণ নিয়ে কোরবানি করার কোনো সার্থকতা ইসলামে নেই, কারণ আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, বরং অন্তরের খাঁটি নিয়ত ও আত্মত্যাগের মানসিকতাই দেখেন।

