রক্তের মতো টকটকে লাল রঙের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের এক সময়ের বুনো ফলটি এখন সমতলে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘রক্তফল’ বা ‘ব্লাড ফ্রুট’ নামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ ও কার্যকারিতা নিয়ে ফুড ভ্লগার এবং চিকিৎসকদের আলোচনার পর দেশজুড়ে এর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ হলেও পাকলে এটি আঙুরের মতো থোকায় থোকায় টকটকে লাল হয়ে ঝুলে থাকে। স্বাদে ফলটি টক-মিষ্টি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের কাছে এই ফলটি বহু বছর আগে থেকেই পরিচিত। অঞ্চল ও ভাষাভেদে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে:
চাকমা ভাষা: রসকো
ত্রিপুরা ভাষা: তাইচক
মারমা ভাষা: রানগুয়চি
অন্যান্য স্থানীয় নাম: রক্ত গোটা, লালগুলা
ইংরেজি নাম: ব্লাড ফ্রুট (Haematocarpus validus)
হিন্দি নাম: খুন ফল
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত ভারতের একদল গবেষকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রক্তফল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ ফল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

এতে সর্বোচ্চ ১.৫% প্রোটিন এবং প্রতি ১০০ গ্রামে ১,৮৯০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম রয়েছে। উচ্চমাত্রার পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড থাকায় এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। রক্তফলে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম এবং আয়রন রয়েছে।
গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে এতে কোনো বিষাক্ততা বা ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে ফলটি মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাহাড়ি কৃষকেরা এখন বনের লতা এনে নিজেদের বাড়ির আঙিনায় ও বাগানে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু করেছেন। লতাজাতীয় এই উদ্ভিদটি রোপণের ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে এবং এর জন্য বাড়তি কোনো পরিচর্যা বা খরচের প্রয়োজন হয় না।
রাঙামাটির নানিয়ারচরের কৃষক লক্ষ্মী নারায়ণ চাকমা জানান, আগে তিনি বন থেকে ফল সংগ্রহ করলেও এখন তাঁর বাগানে ১৫টি গাছ রয়েছে, যেখান থেকে বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি ফল পাওয়া যায়।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘কাপ্তাই বাজার’ ও স্থানীয় বিক্রেতাদের মতে, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রক্তফলের প্রচুর অর্ডার আসছে। রাঙামাটির বাইরে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি পর্যন্ত ফল সরবরাহ করা হচ্ছে।
মৌসুমের শুরুতে ও শেষে: প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। মৌসুমের মাঝামাঝি (ভরা মৌসুম): প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে জুন পর্যন্ত এই ফলের মৌসুম থাকে। যদিও দেশে এখনো এর ওপর বড় কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন রেকর্ড করা হয়নি, তবে গত বছরের তুলনায় এবার বাজারে এই ফলের সরবরাহ দ্বিগুণেরও বেশি। এটি একটি বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ হওয়ায় ব্যক্তিপর্যায়ে চাষিদের এটি রোপণ ও সংরক্ষণের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।

