মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মাঝে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।
বেইজিংয়ে দুই শীর্ষ নেতার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শি জিনপিং তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না। এছাড়া বৈশ্বিক তেল সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালির ওপর যেকোনো ধরনের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা জোরপূর্বক টোল আরোপের ঘোর বিরোধী বেইজিং।
মূলত নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই চীন এই রুটটি খোলা রাখতে বদ্ধপরিকর, কারণ এই পথ দিয়েই চীন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বৈঠকের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে একমত হয়েছেন শি জিনপিং। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তেলের নির্ভরতা কমাতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল, এলএনজি (LNG) এবং সয়াবিন কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সাথে মার্কিন অর্থনীতিতে বড় গতি আনতে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০টি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ কেনার বিষয়েও সম্মতি জানিয়েছে।
বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিষয়ে সমঝোতার আবহ থাকলেও তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে দুই নেতার মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ও উত্তাপ লক্ষ্য করা গেছে। শি জিনপিং অত্যন্ত কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “তাইওয়ান ইস্যুটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক লাল রেখা (Red Line)। এই বিষয়ে সামান্য ভুল পদক্ষেপ দুই পরাশক্তিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধে চীনের অবস্থান অত্যন্ত প্রভাবশালী। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চীন দীর্ঘ দিন ধরে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হওয়ায় তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, চীন এই প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে একটি গ্রহণযোগ্য পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে রাজি করাবে।
যদিও চীনের সরকারি বিবৃতিতে সরাসরি ইরান প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তবে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী—জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দুই দেশই আপাতত একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বেইজিং সফরকালে ট্রাম্প শি জিনপিংকে ‘একজন মহান নেতা’ হিসেবে অভিহিত করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এক নতুন দুয়ার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

