খাদিমুল সরদার, বেরোবি প্রতিনিধি:
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার ১৭ বছরেও সেকেন্ডারি লেভেলে উন্নীত হয়নি।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি বিভাগে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর প্রায় চার হাজার। তবে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে কর্মরত চিকিৎসক মাত্র চারজন।
এছাড়াও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো গাইনি বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে শিক্ষার্থীদে বাড়তি খরচ করে যেতে হচ্ছে বাইরের ক্লিনিকে বা হাসপাতালে।
সেকেন্ডারি লেভেলে সাধারণ চিকিৎসার বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা সেবা প্রদান, প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (রক্ত, এক্স-রে, ইউরিন ইত্যাদি), এবং স্বল্পমেয়াদি ভর্তির সুবিধা প্রদান করা হয়। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সেবা, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা সেকেন্ডারি লেভেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে করে শিক্ষার্থীরা সামান্য থেকে মাঝারি রোগের চিকিৎসা ক্যাম্পাসেই পেতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পার হলেও মেডিকেল সেন্টার এখনো ২৪ ঘণ্টা চালু করা হয়নি। নেই কোনো আবাসিক চিকিৎসকের ব্যবস্থাও। সেবার মান প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।
সরেজমিনে জানা যায়, মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো প্রাথমিক স্তরেই আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ভবনের নিচ তলায় তিন-চারটি কক্ষ নিয়ে মেডিকেল সেন্টারটি সেবা দিচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত জায়গা। মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৪ জন, নার্স মাত্র ১ জন। বিপরীতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার মানুষ এই সেবার ওপর নির্ভরশীল।
মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে সেবা নেন। আর এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রায় ৫০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০০০ জনসংখ্যার জন্য ১ জন চিকিৎসক এবং প্রতি চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স থাকা প্রয়োজন। সেখানে বেরোবিতে একজন চিকিৎসককে গড়ে প্রায় ২২৫০ জনকে সেবা দিতে হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
একাধিক শিক্ষার্থী জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য বাইরের ক্লিনিকে যেতে হয়। এতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুক্রবার ও শনিবার মেডিকেল সেন্টার বন্ধ থাকে। এছাড়া বর্তমানে জ্বালানি সংকটে অফিস টাইম ৪ টা পর্যন্ত হওয়ায় মেডিকেল সেন্টার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত সীমিত সময় সেবা দেওয়া হয়, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত নয়। জরুরি অবস্থায় শয্যা সুবিধা না থাকায় রোগীদের প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, মেডিকেল সেন্টারকে সপ্তাহে সাত দিন এবং ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযোজন এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত রাফি বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, জরুরি সেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এমনকি সামান্য আঘাতের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক সেলাইয়ের ব্যবস্থা নেই, ফলে বাইরে যেতে বাধ্য হতে হয়।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল নিয়োগ, জরুরি সরঞ্জাম নিশ্চিতকরণ ও ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিম জান্নাত তানিম বলেন, মানুষের অসুস্থতা কখনো সময় বা স্থান-কাল ভেদে আসে না। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার বিকেল ৫টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যা বা রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও পাওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ ও মানসম্মত চিকিৎসকও নেই। এ কারণে অনেক সময় আমাদের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
এদিকে গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে প্রতি বুধবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খণ্ডকালীন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ সেবা চালু করা হয়েছিল। এ সেবা দিতেন প্রাইম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল-এর মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. খন্দকার আনজুমানারা বেগম শীলা। পরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞও যুক্ত করা হয়। তবে রমজানের ঈদের ছুটির পর থেকে এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা বন্ধ রয়েছে।
এ ব্যাপারে ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ও অফিস প্রধান (ডেন্টাল সার্জন) ডা. এ. এম. এম. শাহরিয়ার বলেন, আমাদের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। সে অনুযায়ী বিদ্যমান সেবায় শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট থাকলেও প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পার হওয়ায় এখন সেকেন্ডারি স্তরের চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৯ হাজার সেবাগ্রহীতার বিপরীতে মাত্র ৪ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন, যা মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ন্যায় সেকেন্ডারি স্তরের চিকিৎসা সেবা চালু করতে হলে পৃথক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতেছি। নতুন করে রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলে কাজ শুরু করছি। আশা করি মেডিকেল সেন্টারের কাজও শুরু করতে পারব৷ এতে মেডিকেল সেন্টারেরও সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।

