বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কয়েক দশকের পুরনো সমীকরণগুলো মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। আল-জাজিরা, রয়টার্স এবং সিএনএন-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার—মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে আমেরিকা যে দাবার ঘুঁটি সাজিয়েছিল, তা এখন তাদের নিজেদের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং ইসরায়েল তোষণ নীতি আমেরিকাকে তার দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
মার্কিন কংগ্রেসের ওপর ইসরায়েলি লবিস্টদের প্রভাব নিয়ে মারজারি টেলর গ্রিনের মন্তব্য কোনো নতুন তথ্য না হলেও, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় বিদেশি লবিস্টদের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্পের ইরান নীতিতে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হওয়ার খবরটি যখন সামনে আসে, তখন ট্রাম্পের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা দেওয়ার চেষ্টা মূলত নিজের ব্যর্থতা ঢাকার একটি মরিয়া চেষ্টা মাত্র। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডির দাবি অনুযায়ী, ইরান কেবল মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদই করেনি, বরং তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর বিপর্যয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত ‘ফাইবার অপটিক’ ড্রোন প্রযুক্তি, যা রাডার বা জিপিএস ছাড়াই নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম, আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। এই প্রযুক্তির উৎস যে ইরান, তা আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। আমেরিকার ইন্টারসেপ্টরগুলো যেখানে ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে ইরানে কোনো স্থল অভিযান চালানো যে আত্মঘাতী হবে, তা বলাই বাহুল্য।
সবচাইতে বড় পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দু জার্মানিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাসে জার্মানির পক্ষ থেকে আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন কড়া সুর আগে কখনো শোনা যায়নি। ইউরোপের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, আমেরিকার অন্ধ অনুগামী হয়ে থাকলে তাদের নিজেদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলরের মন্তব্য এবং প্রতিরক্ষা বাজেটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত সিগন্যাল দিচ্ছে যে, ‘কন্টিনেন্টাল ইউরোপ’ অচিরেই মার্কিন বলয় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব শক্তি বলয় তৈরি করবে।
যুদ্ধের প্রভাব কেবল ইউরোপ বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি ফাটল ধরিয়েছে আরব দেশগুলোর ঐক্যেও। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভেতর থেকে ‘শারজাহ’ এর আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা ‘রিপাবলিক অফ শারজাহ’ গঠনের গুঞ্জন ইঙ্গিত দেয় যে, এই অঞ্চলের মানচিত্রও বদলে যেতে পারে। একদিকে আমেরিকা যখন বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে রাশিয়া এবং চীন এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে নিচ্ছে।
উপসংহারে বলা যায়, কয়েক দশকের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের এই সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ইভানা কতাসোভার ভাষায় যুদ্ধে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, দিনশেষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে, তা খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। অধ্যাপক মারান্ডির আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ—ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে বা কূটনীতিতে জিতবেই—আজ আর কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। বিশ্ব এখন এক নতুন ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা বিশ্বব্যবস্থার অপেক্ষায়, যেখানে একক কোনো পরাশক্তির দাপট হয়তো আর অবশিষ্ট থাকবে না।

