দক্ষিণ লেবাননের শান্ত গ্রাম ডেবিলের উপকণ্ঠে এক ইসরায়েলি সেনার হাতে ধরা হাতুড়িটি যখন যিশুখ্রিষ্টের মূর্তির ওপর আছড়ে পড়ছিল, তখন তা কেবল একটি পাথরের ভাস্কর্যকে চূর্ণ করেনি, বরং গুঁড়িয়ে দিয়েছে ধর্মীয় সহনশীলতার শেষ চিহ্নটুকুকেও।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই একটি ছবি বর্তমানে বিশ্ববিবেকের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এক্স প্ল্যাটফর্মে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের চোখে পড়া এই ধ্বংসলীলা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ যখন অন্ধ প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন কোনো পবিত্র স্থান বা প্রতীকই আর নিরাপদ থাকে না।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ছবিটির সত্যতা স্বীকার করে তদন্তের আশ্বাস দিলেও ফিলিস্তিনি সংসদ সদস্য আয়মান ওদেহের উপহাসমূলক মন্তব্যটিই যেন রূঢ় বাস্তবতা—পেশাদার বাহিনীর নামে এমন এক গোষ্ঠীকে লেবানন ও গাজায় লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে যারা সম্ভবত এই মূর্তির মাঝেই কোনো ‘নিরাপত্তা হুমকি’ খুঁজে পেয়েছিল।
এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীরতর ঘৃণা ছড়ানোর প্রক্রিয়ার অংশ। আহমেদ তিবির মতো সচেতন রাজনীতিকরা যখন গাজার মসজিদ-গির্জা ধ্বংস করা কিংবা জেরুজালেমের যাজকদের গায়ে থুতু ফেলার প্রসঙ্গ টানেন, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ধর্মীয় অবমাননা এখন সেখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং তার অনুসৃত ‘বর্ণবাদী শিক্ষা’ যে এই ধরণের উগ্রবাদীদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে, তা আজ আর লুকানোর সুযোগ নেই। পাশ্চাত্য বিশ্ব যখন মানবাধিকর ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ছবক দেয়, তখন লেবানন বা ফিলিস্তিনের পবিত্র চিহ্নগুলো পদদলিত হতে দেখে তাদের রহস্যময় নীরবতা বর্ণবাদীদের এই বার্তা দেয় যে—পবিত্রতার সংজ্ঞা কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করে।
পরিসংখ্যানগুলো আরও বেশি আতঙ্কজনক। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল জেরুজালেমেই খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ২০০-এর বেশি সহিংসতার ঘটনা এবং পশ্চিম তীরে অর্ধশতাধিক মসজিদে হামলা প্রমাণ করে যে, এই আগ্রাসন কেবল ভূখণ্ডের দখল নয়, বরং পরিচয়ের বিলোপ ঘটানোর একটি পরিকল্পিত ছক।
ডেবিল গ্রামের সেই যিশুর মূর্তি ভাঙার ছবি মূলত সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতারই দলিল, যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করলেও ধর্মের অবমাননায় নিশ্চুপ থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ধরণের ‘সশস্ত্র অসহিষ্ণুতা’র বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কঠোর অবস্থান না নেবে, ততক্ষণ হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত কেবল মূর্তিতে নয়, বরং সভ্যতার বুকেই বিদ্ধ হতে থাকবে। লেবাননের মাটিতে হাতুড়ি হাতে সেই সৈনিকের অবয়বটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর সেই অন্ধকারেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে শক্তির দাপটে বিশ্বাসের মর্যাদা ধুলোয় লুণ্ঠিত।

