ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কখনো কখনো এতটাই অদ্ভুত হয় যে, তা সমান্তরাল রেখায় চলতে শুরু করে। ১৯৭৯ সালের তেহরান জিম্মি সংকট এবং অপারেশন ইগল ক্ল-এর সেই দুঃস্বপ্ন আজও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন রাষ্ট্রপতি হোয়াইট হাউসে থাকেন, যার কাছে ব্যক্তিগত ইমেজ এবং ‘উইনিং স্ট্রিক’ বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়।
৩ এপ্রিল ইরানের আকাশে মার্কিন এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগল ভূপাতিত হওয়ার পর যে নাটকীয়তা তৈরি হলো, তা কেবল একটি উদ্ধার অভিযান ছিল না, বরং তা ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পের সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিৎকার আর অস্থিরতা প্রমাণ করে তিনি কতটা আতঙ্কিত ছিলেন যে, পাছে তাকেও জিমি কার্টারের মতো ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রপতি’র তকমা জুটিয়ে বিদায় নিতে হয়।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য পরিস্থিতি তখন দ্বিমুখী যুদ্ধের মতো ছিল—একদিকে ইরানি সীমান্তে আটকে পড়া অফিসারকে উদ্ধার, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের ভেতরে একজন অধৈর্য এবং খামখেয়ালি রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ সামলানো। ট্রাম্পের অস্থিরতা যখন উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছিল, তখনই তাকে সিচুয়েশন রুম থেকে বের করে দেওয়ার মতো অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন কর্মকর্তারা। এটি মার্কিন ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা, যেখানে সেনাপ্রধান ও গোয়েন্দারা খোদ কমান্ডার-ইন-চিফকে দরজার বাইরে রেখে অপারেশন পরিচালনা করেন। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার: রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বের সাথে অভিযান শেষ করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—ট্রাম্পকে বাইরে রেখেও কি আমেরিকা শেষ পর্যন্ত তার সম্মান রক্ষা করতে পেরেছে?
আমেরিকা এই অভিযানকে ‘সফল’ বলে দাবি করলেও এর পেছনের ক্ষয়ক্ষতি আর প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। একদিকে যেখানে একজন অফিসারকে উদ্ধারের গল্প শোনানো হচ্ছে, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, এই অভিযানের আড়ালে লক্ষ্য ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে আঘাত করা বা তথ্য চুরি করা। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই একটি মিশনেই আমেরিকা তাদের ২টি এমসি-১৩০, ২টি ব্ল্যাকহক এবং ড্রোনসহ মোট ১২টি আকাশযান হারিয়েছে। পেন্টাগন এর আংশিক স্বীকারোক্তি দিলেও বিশাল এই ক্ষয়ক্ষতি একটি সফল অভিযানের সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি ১২টি আকাশযান ধ্বংস হয় এবং মূল উদ্দেশ্য যদি ইউরেনিয়াম চুরি হয়ে থাকে—যা অর্জিত হয়নি—তবে এই অভিযানকে কেবল ‘জীবন বাঁচানোর মিশন’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়াটা এক প্রকার হাস্যকর।
শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সিচুয়েশন রুমের দরজার বাইরে রাখার কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক সুফল মেলেনি। ট্রাম্পের প্রশাসনের অনুগত কিছু লোক ছাড়া খোদ আমেরিকানরাই এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে সন্দিহান। বরং ট্রাম্পকে বাইরে রাখায় এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, খোদ আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ তাদের রাষ্ট্রপতির বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা হারিয়েছিল। অপারেশন ইগল ক্ল-এর ব্যর্থতা যেমন জিমি কার্টারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছিল, এই ৩ এপ্রিলের ঘটনাও ট্রাম্পের জন্য একই ধরণের প্রতীকী পরাজয় বয়ে এনেছে। ১২টি আকাশযান হারানো এবং কমান্ড কাঠামোর এই বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, কক্ষের ভেতরে কিংবা বাইরে—যেখানেই ট্রাম্প থাকুন না কেন, ইরানের মাটিতে আমেরিকার ‘সফল’ হওয়ার স্বপ্ন আজও সেই ১৯৭৯ সালের ধুলোঝড়েই আটকে আছে। ট্রাম্পকে দরজার বাইরে রেখে হয়তো বিশৃঙ্খলা কমানো গেছে, কিন্তু পরাজয়ের গ্লানি মোছা সম্ভব হয়নি।

