মধ্যপ্রাচ্যের বালুচরে আজ যে ক্ষমতার লড়াই চলছে, তা কেবল সীমানা রক্ষার লড়াই নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থার একক মোড়ল হিসেবে আমেরিকার টিকে থাকার অন্তিম লড়াই। গতকালের ভবিষ্যৎবাণী আজ হরমুজ প্রণালির নীল জলে বাস্তব রূপ নিয়েছে।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কেবল মৌখিক আশ্বাসে বা ট্রাম্পীয় টুইট-কূটনীতিতে তারা ভুলবার পাত্র নয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তেহরান যে শক্তিমত্তা দেখিয়েছে, তা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করছিলেন যে ইরান নতি স্বীকার করেছে, ইউরেনিয়াম দিয়ে দিচ্ছে এবং হরমুজ খুলে দিয়েছে—ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালিতে ইরানি স্পিডবোটের গুলির আওয়াজ সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। আল-জাজিরার অডিও বার্তায় ইরানি নেভির যে পেশাদার অথচ কঠোর ভঙ্গি দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই। আমেরিকার তথাকথিত সামরিক বিশেষজ্ঞ শন বেল-এর ভাষায়, এটি স্রেফ একটি ‘পাওয়ার প্লে’। ইরান আগ বাড়িয়ে কোনো যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তারা এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে তাদের ভূখণ্ডে বা স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা কতটুকু যেতে পারে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যখন একদিকে বলেন, “ইরান আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না”, আর তার পরক্ষণেই বলেন, “নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছি”—তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যুদ্ধের টার্মগুলো এখন তেহরান থেকে নির্ধারিত হচ্ছে। ইরান আজ কেবল একটি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দেশ নয়, বরং তারা একটি ‘স্মার্ট পাওয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা জানে কখন গুলি ছুড়তে হয় আর কখন আলোচনার ফ্রেমওয়ার্ক ছুড়ে দিতে হয়।
বিখ্যাত তাত্ত্বিক রবার্ট পেপ এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডির বিশ্লেষণ এক বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে—আমরা সম্ভবত একটি প্রলম্বিত যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মারান্ডির বিশ্লেষণটি চমকপ্রদ; ইরান হয়তো কৌশলগতভাবে আমেরিকাকে তাদের মাটিতে বা দ্বীপে স্থল অভিযানের সুযোগ দেবে, কিন্তু সেটি হবে মূলত একটি ফাঁদ। ২০ বছর ধরে ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তিতে ইরান যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, তার মূল লক্ষ্য একটাই—আমেরিকায় ‘বডি ব্যাগ’ (লাশবাহী ব্যাগ) পাঠানো। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানে আমেরিকা যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ইরান তাকে আরও ভয়াবহ রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ আজ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গায়েও লাগছে। তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার দায়ভার সরাসরি আমেরিকার একক আধিপত্যবাদী নীতির ওপরই বর্তাচ্ছে। এমনকি কাতারের মতো মিত্র দেশগুলোও এখন ট্রাম্পের অসংলগ্ন আচরণের সমালোচনা করে ইরানের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলছে। এটিই প্রমাণ করে যে, আমেরিকার ‘একক মোড়ল’ হওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে।
আমরা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বিশ্ব আজ ‘ইউনিপোলার’ বা একক শক্তিধর কেন্দ্র থেকে ‘মাল্টিপোলার’ বা বহু শক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকান অর্ডার আজ ভঙ্গুর। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আজ যে শক্তি ও সাহসের মহড়া দিচ্ছে, তা কেবল ওই অঞ্চলের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য একটি বার্তা। পৃথিবী আর আগের অর্ডারে ফেরত যাবে না। আমরা এমন এক আগামীর দিকে যাচ্ছি যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য একেক অঞ্চলে একেক দেশের হাতে থাকবে—আর মধ্যপ্রাচ্যে সেই মূল চাবিকাঠিটি এখন নির্দ্বিধায় ইরানের হাতে।

