লেখক: তারেক হাসান শেখ
বিশ্ব রাজনীতিতে সমীকরণের যে নাটকীয় পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি, তা সম্ভবত কেবল এ বছরের নয়, বরং এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সংবাদ। যে ‘স্ট্রেইট অফ হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা, আজ পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টো।
এদিকে, ইতিহাস সাক্ষী হতে যাচ্ছে এমন এক নজিরবিহীন ঘটনার- যেখানে আমেরিকার বিরুদ্ধেই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের বৃহত্তম কৌশলগত অবরোধ।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধের আগে ইরান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, আমেরিকা আজ ঠিক সেই অবস্থানে। অন্যদিকে ইরান পৌঁছে গেছে সেই জায়গায়, যেখানে একসময় আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো।
এই সংকটের আগে ইরান ছিলো বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। আমেরিকার চাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশসহ ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বড় ধরনের প্রায় এক হাজার নিষেধাজ্ঞার জালে আটকা পড়ে ইরানের ব্যবসাবাণিজ্য এবং অপরিশোধিত তেল বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
অথচ, গত ৪০ দিনের যুদ্ধ যেনো ইরানের জন্য এক ‘সঞ্জীবনী’ হয়ে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে বিশ্বশক্তিগুলো ইরানকে ঘিরে ফেলেছিল, এখন দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র- আমেরিকার বিরুদ্ধেই তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক দেওয়াল।
একসময় বিশ্বের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে আমেরিকা যে দাপটের সাথে নাক গলাতো, সেই দাপট আজ হুমকির মুখে। যে আমেরিকা কখনও কারও কাছ থেকে ‘না’ শুনতে অভ্যস্ত ছিলো না, আজ বিশ্ব সম্প্রদায় তাকে সজোরে ‘না’ বলতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্র ন্যাটোর (NATO) পক্ষ থেকে। ৩২টি দেশের এই বৃহত্তম সামরিক জোট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরান যুদ্ধে তারা আমেরিকাকে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা প্রদান করবে না। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘পেপার টাইগার’ বা কাগুজে বাঘ হিসেবে অভিহিত করেন এবং জোট ছাড়ার হুমকি দেন। কিন্তু ন্যাটো তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
একই পথে হেঁটেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। জোটের ২৭টি দেশ আমেরিকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। জার্মানি এবং ফ্রান্স সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি, ইতালি আমেরিকাকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি পর্যন্ত দেয়নি।
এছাড়া পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড এবং আমেরিকার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী কানাডাও আমেরিকার বর্তমান অবস্থানের বিপক্ষে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্বস্ত মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াও কোনো সাহায্য করতে রাজি হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যেও আমেরিকা তার দীর্ঘদিনের প্রভাব হারাচ্ছে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন আমেরিকার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ওআইসি (OIC) এবং এসসিও (SCO)-র মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো আমেরিকার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর বিপরীতে চীন এবং রাশিয়া এখন ইরানের সমর্থনে এক শক্তিশালী জোট গঠন করছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে।
ধর্মীয় ও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। ভ্যাটিকান সিটির পোপ লিও এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এমনকি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাথে এই ইস্যুতে ট্রাম্পের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। খোদ আমেরিকার ভেতরেও ৫১ শতাংশ নাগরিক এই যুদ্ধের বিপক্ষে, যেখানে মাত্র ২৪ শতাংশ মানুষ সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।
১৯৪৫ সাল থেকে বিশ্বের ২৬টি দেশে বোমা হামলা চালানো আমেরিকা এতোদিন অন্য রাষ্ট্রগুলোকে পারমাণবিক অস্ত্র ও শান্তির বিষয়ে নসিহত দিয়ে এসেছে। অথচ, ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিশ্বাস হারিয়ে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে একঘরে হয়ে আমেরিকা নিজেই এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ব রাজনীতির এই নতুন মেরুকরণ আগামীর দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

