পরিচালক শঙ্খ দাশগুপ্তের মুন্সিয়ানায় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের শুরুতে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চা গরম’ কেবল একটি ওয়েব ফিল্ম নয়, বরং এটি চা-বাগানের মানুষের না বলা কথা আর আগামীর স্বপ্নের এক দারুণ মেলবন্ধন।
সাইফুল্লাহ রিয়াদের চিত্রনাট্যে চা-বাগানের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবন, সংগ্রাম আর আশা-আকাঙ্ক্ষার গল্পটি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ফুটে উঠেছে। সিনেমার শুরুতে বরকত হোসাইনের ক্যামেরায় চা প্রক্রিয়াজাতকরণের দৃশ্যগুলো দর্শককে শুরুতেই গল্পের ভেতরে টেনে নেয়। পৌনে দুই ঘণ্টার এই মুভিতে দারিদ্র্য বা বৈষম্যের রগরগে প্রদর্শনী এড়িয়ে শিল্পের নান্দনিকতা বজায় রাখা হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
একজন সম্পন্ন ঘরের আদুরে অথচ সংবেদনশীল চিকিৎসকের চরিত্রে সাফা কবিরের পরিমিত অভিনয় ছিল চমৎকার।
পার্থ শেখ তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি এবং দর্শককে হাসানোর সহজাত ক্ষমতা মিঠু চরিত্রটিকে প্রাণবন্ত করেছে।
সারাহ জেবীন ও রেজওয়ান পারভেজ: নন্দিনী ও রবিন চরিত্রে এই দুই নবাগত বা উঠতি শিল্পীর অভিনয় ছিল সিনেমার সবচেয়ে বড় চমক। তাদের চোখ ও শরীরের ভাষা চা-বাগানের মাটির ঘ্রাণ নিয়ে এসেছে।
এ কে আজাদ সেতু চা-বাগানের ম্যানেজারের গাম্ভীর্য ও পুরোনো মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে তিনি ছিলেন এক কথায় অনবদ্য।
মারিয়া হক সরকারের পোশাক পরিকল্পনা এবং আতিয়া রহমানের রূপসজ্জা চরিত্রগুলোকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। রুসলান রেহমানের সংগীত এবং শৈব তালুকদারের সাউন্ড মিক্সিং চা-বাগানের রোদেলা দুপুর আর নিস্তব্ধ রাতের আবহকে জীবন্ত করেছে। সম্পাদনা ও কালার গ্রেডিংয়ের সুনিপুণ ছোঁয়া সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমকে অর্থবহ করে তুলেছে।
সিনেমাটির একটি সংলাপ বিশেষভাবে দাগ কেটে যায়—“চা-গাছকে বড় হতে দেওয়া হয় না, নিজেদের সুবিধার জন্য কেটে ছোট করে রাখা হয়।” এটি কেবল চা-গাছের কথা নয়, বরং আমাদের সমাজের সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোকে দাবিয়ে রাখার এক তিক্ত সত্যকে তুলে ধরেছে। অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাই যে উন্নত সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি, সেই গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিই এখানে শৈল্পিক বয়ানে উঠে এসেছে।
তেত্রিশের পয়লা বৈশাখে শঙ্খ দাশগুপ্ত ও চরকি টিমকে এমন একটি সময়োপযোগী কাজের জন্য অভিনন্দন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অক্সফ্যাম এবং রবির মতো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পকে বড় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

