কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। ভোরের আলোয় যেখানে একদিকে পর্যটকের ভিড় শুরু হয়, ঠিক তারই পাশে চলতে থাকে এক নীরব ও কঠিন জীবনসংগ্রাম। ঢেউয়ের গর্জন আর জাল টানার ব্যস্ততার মধ্যে গড়ে উঠেছে উপকূলীয় মানুষের জীবিকার এক ভিন্ন বাস্তবতা।
এখানে চিংড়ির রেনু সংগ্রহ শুধু পেশা নয়, অনেকের জন্য টিকে থাকার একমাত্র পথ। সমুদ্র ঘিরে গড়ে ওঠা এই কাজে নারী, পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে। স্থানীয় এক শিক্ষার্থী প্রতিদিন সমুদ্রে নেমে রেনু সংগ্রহে অংশ নেয়। নিজের ভাষায় সে জানায়, এটি তার নিত্যদিনের কাজ। সূক্ষ্ম জাল দিয়ে পানির ভেতর থেকে চিংড়ির রেনু সংগ্রহ করে সে বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে যায়।
স্থানীয় আড়তে প্রতি হাজার রেনু বিক্রি হলে পাওয়া যায় প্রায় ৪০ টাকা, আর বাজারে এর দাম কিছুটা বেশি—প্রায় ৫০ টাকা। সামান্য এই আয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটাতে হচ্ছে অনেককেই, বিশেষ করে শিশুদের।
জেলেরা জানান, তারা মূলত জোয়ারের সময় সমুদ্রে নেমে এই রেনু সংগ্রহ করেন। পরে তা স্থানীয় আড়ৎ ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছে যায়। দিনভর পরিশ্রমের পর আয় নির্ভর করে মৌসুম ও চাহিদার ওপর, যা অনেক সময় খুবই সীমিত থাকে।
সমুদ্রের পাড়ে আরেকটি ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে গৃহিণী ও কিশোরীরা সংগৃহীত রেনু বাছাইয়ের কাজ করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে তারা রেনু আলাদা করেন, যা পরবর্তী বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। এই শ্রমসাধ্য কাজ স্থানীয় অর্থনীতিতে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করছে।
চিংড়ি শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় খাত হলেও এর পেছনের শ্রম বাস্তবতা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে শিশুদের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের কাজে শিশুদের যুক্ত থাকা তাদের শিক্ষা ও শৈশব বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
কুয়াকাটার এই বাস্তবতা শুধু একটি অঞ্চলের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের উপকূলীয় জীবনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। সমুদ্র যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি কখনও কখনও হয়ে ওঠে কঠিন সংগ্রামের প্রতীক।
এই বাস্তবতা বদলাবে কবে-এ প্রশ্নই এখন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সমাজের কাছেও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

