বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় শুরু হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অধিবেশন নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
অধিবেশন শুরুর সময় স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন এবং আরেকজন সদস্য তা সমর্থন করবেন। ওই সদস্যের সভাপতিত্বেই অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে।
জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতে দেখা যেতে পারে। তার সভাপতিত্বে প্রথম দিন শোক প্রস্তাব উত্থাপন এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এরপর প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি রাখা হবে। এই সময়ের মধ্যে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
পরে নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে আবার অধিবেশন শুরু হলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মনোনয়ন, সাবেক স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করতে সংসদে উত্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করতে হবে, না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
অধিবেশনের প্রথম দিন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করার আভাস দিয়েছে।
এদিকে সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশে ট্রেজারি বেঞ্চে বসবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনও একই সারিতে থাকবেন।
সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। অধিবেশন কক্ষের আসন বিন্যাসসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সংস্কার সম্পন্ন করেছে সংসদ সচিবালয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় বিক্ষোভে জাতীয় সংসদ ভবনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা সংস্কার করে নতুন রূপে প্রস্তুত করা হয়েছে।
জানা গেছে, অধিবেশন শুরুর পর দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) সংসদের বিরতি থাকবে। এরপর ১৫ মার্চ আবার অধিবেশন বসবে। ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ থেকে আবার সংসদের কার্যক্রম শুরু হবে। এই অধিবেশনেই সংসদ উপনেতা, সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের সদস্যদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে। অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং পরে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের বড় দায়িত্ব পড়েছে এই সংসদের ওপর। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই সংসদে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক নির্দেশনা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সংসদ ভবনসংলগ্ন কয়েকটি সড়কে যান চলাচলে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শুরু হতে যাওয়া এই সংসদ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে নতুন গতি দিতে পারে কি না—সেদিকেই এখন নজর সবার।

