বাংলাদেশের টেলিভিশনের পর্দায় এমন কিছু মুখ আছে, যাদের দেখা মানেই দর্শকের মনে ভরসা জাগে। সেই মুখগুলোর একটি হলেন হানিফ সংকেত। দীর্ঘদিন ধরে হাসি, ব্যঙ্গ, সচেতনতা আর নান্দনিকতার মিশেলে তিনি তৈরি করেছেন এক অনন্য জগৎ—‘ইত্যাদি’র জগৎ। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এবার রাষ্ট্র তাঁকে দিল দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলোর একটি—স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬।
গত ৫ মার্চ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় শুভেচ্ছার বন্যা। সংস্কৃতি অঙ্গনের শিল্পী, নির্মাতা থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—অনেকেই তাঁর ছবি শেয়ার করে অভিনন্দন জানান। অনেকেই তাঁকে অভিহিত করেন “কথার জাদুকর” হিসেবে—যিনি স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দজ্ঞান এবং সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানকে নিজের আয়ত্তে রেখে এগিয়ে নিতে পারেন।
অনেকের কাছে এই ঘোষণা যেন এক ধরনের স্বস্তি। যেন রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল—সুস্থ, শালীন বিনোদনও একটি জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টেলিভিশনের পর্দা দিয়েও যে সমাজকে ভাবানো, নাড়া দেওয়া এবং সচেতন করা যায়—এই সত্যেরই এক অর্থবহ স্বীকৃতি বলে মনে করছেন অনেকে।
এক মানুষ, বহু পরিচয়
হানিফ সংকেত শুধু একজন উপস্থাপক নন। তিনি পরিচালক, লেখক, প্রযোজক, গায়ক, সুরকার ও গীতিকার—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক শিল্পী। তাঁর নির্মিত জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি–তে প্রচারিত অনেক জেলাভিত্তিক গানের সুর করেছেন তিনি নিজেই, আবার অনেক গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন।
বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি অনুষ্ঠানকে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় রাখাটা সহজ নয়। কিন্তু ‘ইত্যাদি’ তা পেরেছে। কারণ এর পেছনে আছে দর্শকের আস্থা—এক ধরনের নীরব চুক্তি। এমন একটি অনুষ্ঠান, যা পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে দেখতে পারে। যেখানে হাসি আছে, কিন্তু অশ্লীলতা নেই; ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; প্রতিবাদ আছে, কিন্তু কুৎসা নেই।
ফজলে লোহানী: পথপ্রদর্শক
টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর প্রথম উপস্থিতি হয়েছিল কিংবদন্তি উপস্থাপক ফজলে লোহানী–র অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান যদি কিছু মনে না করেন–এর সূত্রেই প্রথম দর্শকের সামনে আসেন হানিফ সংকেত।
ফজলে লোহানীর কথা বলতে গিয়ে আজও তাঁর কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা শোনা যায়। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফজলে লোহানী ছিলেন বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকতার জনক এবং টেলিভিশনের প্রথম সুপারস্টার। দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর বন্ধু ও অভিভাবক। ক্যানটিনের আড্ডা, গল্প আর সেই গল্পের মধ্যেই লেখালেখির শিক্ষা—এইসব স্মৃতি গড়ে তুলেছিল হানিফ সংকেতের প্রস্তুতির ভিত।
‘ইত্যাদি’র জন্ম
১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন–এ প্রথম প্রচারিত হয় ইত্যাদি। এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ যাত্রার রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হানিফ সংকেত বারবার দর্শকের ভালোবাসার কথা বলেন। তবে তিনি একটি বড় সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন—স্টুডিওর চার দেয়াল ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠান ধারণ করা।
এই সিদ্ধান্তই ‘ইত্যাদি’কে আলাদা করে দেয়। প্রতিটি পর্বে উঠে আসে একটি জেলার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি, মানুষের ভাষা আর জীবনের গল্প। ফলে অনুষ্ঠানটি যেন ধীরে ধীরে তৈরি করেছে বাংলাদেশের এক সাংস্কৃতিক মানচিত্র।
নৈতিকতা আগে
হানিফ সংকেতের মতে, টেলিভিশনের মূলমন্ত্র হলো শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদনের সমন্বয়। ‘ইত্যাদি’ সেই নীতিতেই চলে। তাঁর মতে, প্রথমে নৈতিকতা—তারপর বস্তুনিষ্ঠ বার্তা। এই নীতিই অনুষ্ঠানটিকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রেখেছে। সময় বদলেছে, দর্শক বদলেছে, কিন্তু পরিবারসহ বসে দেখার নিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
সমাজের গল্প বলা
‘ইত্যাদি’ শুধু হাসির অনুষ্ঠান নয়। এটি বহুদিন ধরে সামাজিক সমস্যা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্পও তুলে ধরেছে। হানিফ সংকেত বিশ্বাস করেন, অসংগতি ও অনিয়ম তুলে ধরলে সমাজ শুদ্ধ হয়। তাই অনুষ্ঠানটিতে যেমন সমস্যার কথা উঠে আসে, তেমনি সামনে আনা হয় নীরবে কাজ করে যাওয়া আলোকিত মানুষদের গল্প। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর পড়েছে এবং সমস্যার সমাধানও হয়েছে।
বিটিভির সঙ্গে সম্পর্ক
আজ যখন অসংখ্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, তখনও ‘ইত্যাদি’ কেন শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন–এই প্রচারিত হয়—এই প্রশ্ন অনেকেই করেন। হানিফ সংকেত বলেন, বিটিভির সঙ্গে তাঁর একটি আত্মিক সম্পর্ক আছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন হওয়ায় এটি কোনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে নয়। তিনি রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেই কাজ করতে চান।
বহুমুখী সৃষ্টিশীলতা
টেলিভিশনের বাইরে নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য নাটক কুসুম—যা নির্মাণ করেছিলেন জনপ্রিয় লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। এ ছাড়া তিনি পরিচালনা করেছেন ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘তোষামোদে খোশ আমোদে’, ‘কিংকর্তব্য’, ‘শেষে এসে অবশেষে’সহ বহু নাটক। রম্য রচনার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর বেশ কিছু বই—‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’, ‘প্রতি ও ইতি’, ‘আটখানার পাটখানা’।
একুশে পদক থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার
এর আগে ২০১০ সালে তিনি পেয়েছেন একুশে পদক। পেয়েছেন জাতীয় পরিবেশ পদকও। তাঁর অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ বহুবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার–এ সেরা টিভি অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ পথচলা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। অনেকের মতে, এই সম্মান শুধু একজন শিল্পীর প্রাপ্তি নয়—এটি সুস্থ বিনোদন, গণমানুষের ভাষা এবং টেলিভিশননির্ভর সংস্কৃতিচর্চারও এক বড় স্বীকৃতি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্দায় তিনি হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন, প্রশ্ন তুলেছেন। আর সেই যাত্রার শেষ নয়—বরং নতুন স্বীকৃতির আলোয় আবারও মনে করিয়ে দিলেন, সুস্থ বিনোদনও পারে একটি জাতিকে আলোকিত করতে।

