যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া ১০ দিনের নাজুক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবাননে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
বুধবার (২২ এপ্রিল) চালানো এই হামলায় বৈরুত-ভিত্তিক দৈনিক ‘আল-আখবার’-এর একজন অভিজ্ঞ নারী সাংবাদিকসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর অঞ্চলটিতে চলমান সাময়িক শান্ত পরিস্থিতি আবারও চরম যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ।
লেবাননের সরকারি সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, দক্ষিণ লেবাননের বিনতে জবেইল জেলাধীন আল-তিরি (Al-Tiri) গ্রামে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হন ৪৩ বছর বয়সী নারী সাংবাদিক আমাল খলিল (Amal Khalil)। তিনি এবং তার সহকর্মী আলোকচিত্রী জয়নাব ফারাজ একটি গাড়িতে থাকা অবস্থায় প্রথম ড্রোন হামলার শিকার হন। প্রাণ বাঁচাতে তারা নিকটস্থ একটি ভবনে আশ্রয় নিলেও ইসরায়েলি বিমান সেখানে আবারও হামলা চালায়, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ডাবল-ট্যাপ’ হামলা হিসেবে অভিহিত করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার পর আমাল খলিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত জয়নাব ফারাজকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, সাংবাদিক ও উদ্ধারকর্মীদের লক্ষ্য করেই সুপরিকল্পিতভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে এ হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি উদ্ধারকাজ ব্যাহত করতে আশপাশের সড়কেও বোমাবর্ষণ করা হয়। দেশটির তথ্যমন্ত্রী পল মরকোস এ ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। লেবানন সরকার একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
একই দিনে দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমোর আল-শাকিফ এলাকায় পৃথক আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় আরও দুইজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা থেকে বের হওয়া দুটি যান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং তারা সরাসরি সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করেনি।
এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে তারা একটি শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এদিকে, চলমান সংঘাতের মধ্যেই ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু বুধবারের হামলা সেই সম্ভাবনাকে ধূসর করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন ইউনিফিলের (UNIFIL) ওপর সাম্প্রতিক হামলায় আহত ফরাসি সেনা করপোরাল আনিসেত গিরার্দিন মারা গেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই ঘটনার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করলেও সংগঠনটি তা অস্বীকার করেছে।
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বিচার হামলা, বেসামরিক নাগরিক ও সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ বারবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক কোনো নিয়ম-কানুন না মেনে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে।
তা সত্ত্বেও, আমেরিকা, ব্রিটেন এবং জার্মানির মতো পশ্চিমা দেশগুলো ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ইসরায়েলকে বিশাল অঙ্কের সামরিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা (যেমন জাতিসংঘে ভেটো প্রদান) দিয়ে লালন-পালন করছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকরা পশ্চিমা বিশ্বের এই ভূমিকাকে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, পশ্চিমারা ইউক্রেনের ক্ষেত্রে যে ধরনের কড়া অবস্থান নেয়, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তারা সেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করে না।
১০ দিনের যুদ্ধবিরতির অষ্টম দিনে এই ভয়াবহ হামলা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

