রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
প্রায় সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের পরপরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগে তা ম্লান হতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ছাত্র সংসদ এখন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণের চেয়ে দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নেই বেশি তৎপর। এতে করে নেতাদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নানা অনিশ্চয়তা ও দাবি-দাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় রাকসু নির্বাচন। এতে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। বাকি তিনটি পদের মধ্যে জিএস পদে আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেল থেকে সাবেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় নার্গিস খাতুন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ তুফা নির্বাচিত হন।
তবে নির্বাচনের সময় থেকেই জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের প্যানেল ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ও আরেক সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব পরে শিবিরের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে। যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন আম্মার।
জিএস হিসেবে তার কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা। শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় থাকলেও ইশতেহার বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এমনকি শিক্ষক হেনস্তা ও বিভিন্ন দাবিতে মব তৈরির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এরই মধ্যে রাকসুর একটি সেমিনার ঘিরে নতুন করে সামনে আসে রাকসুর নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি। ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি: সংকটের পথে দেশ’ শীর্ষক ওই সেমিনার সম্পর্কে আগে থেকে অবগত ছিলেন না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন জিএস আম্মার। তিনি এতে অংশও নেননি। ওই সেমিনারে আইনজীবী শিশির মনির ও ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড প্রদর্শন করে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ক্রীড়া সম্পাদক নার্গিস খাতুনও। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, রাকসুর একজন সম্পাদক হয়েও এ ধরনের প্রোগ্রাম সম্পর্কে অবগত না থাকা থেকে বোঝা যায়, একটি অংশ এককভাবে কাজ করছে।
এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জিএস আম্মার বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হওয়ায় স্বতন্ত্র ও অন্য প্যানেলের সদস্যদের মতামত অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। রাকসুর সম্পাদকরা অনেক সময় ভিপির কনসার্নে প্রোগ্রাম আয়োজন ও অতিথি নির্বাচন করে থাকে।”
রাকসুর সব সিদ্ধান্ত শিবির নিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নে আম্মার বলেন, “তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, তাই তাদের সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি এসব নিয়ে পড়ে থাকতে চাই না, আমি আমার কাজ করতে চাই।”
অন্যদিকে এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি বলেন, “শিবির-সমর্থিত প্যানেলের বাইরে থাকা সদস্যদের মতামত উপেক্ষার কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ জিএস দিতে পারেননি। বরং তার ইশতেহার বাস্তবায়নে সবাই সহযোগিতা করছে। যেকোনো সিদ্ধান্ত আমরা আলোচনার মাধ্যমেই নেই। সমন্বয়হীনতা নয়, এটি স্বাভাবিক মতপার্থক্য।”
আদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকবেই। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে একসঙ্গেই কাজ করছি।”
ইশতেহার বাস্তবায়নে কতটা তৎপর রাকসু?
নির্বাচনে জয়লাভের সময় রাকসু ২৪টি প্রতিশ্রুতি দেয়, যা ভেঙে দেখলে প্রায় ১০০টির মতো কাজের সমতুল্য। তবে সেই ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
শপথ গ্রহণের ১০০ দিন পর রাকসু তাদের কার্যক্রমের একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ১০৩টি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এই তালিকার অন্তত ৩০টি কার্যক্রমই ছিল মতবিনিময় সভা, সৌজন্য সাক্ষাৎ, কবর জিয়ারত, স্ক্রিনে খেলা প্রদর্শন, স্মারকলিপি প্রদান ও কাওয়ালীর মতো আয়োজন—যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
এছাড়া ইশতেহারে থিসিস শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ হাজার টাকা প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেও তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এদিকে সহ-বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক নয়ন মোরসালিন ক্যাম্পাস বন্ধের সময় শিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনের ছাদে সীমিত পরিসরে একটি বিতর্ক কর্মশালার আয়োজন করলে সেটিও সমালোচনার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ নির্বাচনের পর জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হন এবং জাতীয় ইস্যুতে সক্রিয় থাকলেও ক্যাম্পাসে তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পর্যায়ে তিনি হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বন্ধের দাবিও জানান।
রাকসুর সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সজিবুর রহমান। তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় তারা যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা পূরণ করতে পারেনি। এখন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। এটি ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক করার একটি চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।”
সমন্বয়হীনতার বিষয়টি জানিয়েছেন রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “রাকসুর সভাপতি হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে আমিও বিভিন্ন সম্পাদকদের মাঝে সমন্বয়হীনতা দেখতে পেয়েছি। এগুলো মিনিমাইজ করার যে চেষ্টা সেটিও তাদের মধ্যে দেখতে পাইনি। তবে আমার সাথে যেসব বিষয় নিয়ে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছিল, আমি সেগুলো সবার সাথে কথা বলে সমাধান করতে বলেছি।”
রাকসুর নেতাদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে রাকসুর সভাপতি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে এই ক্ষেত্রে আমি কোন বিধি আরোপ করতে পারিনা। শিক্ষার্থীরাই তাদের এসব কাজের মূল্যায়ন করবে।”

