পূর্ব লাদাখের পর এবার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)। সেখানে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি, ক্যাম্প ও বাঙ্কার তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় প্রাচীন আদিবাসীদের চারণভূমি ও কৃষিজমিসহ বিস্তীর্ণ কৌশলগত এলাকা এখন বেইজিংয়ের সম্পূর্ণ দখলে। অরুণাচল প্রদেশের একটি স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন সীমান্ত এলাকায় চীনের এমন বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ও স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ ও ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ‘নাহ’ আদিবাসীদের একটি সংগঠন দাবি করেছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) পেরিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ঢুকে চীনা বাহিনী ইতিমধ্যে পাকাপোক্ত ঘাঁটি ও রাস্তা গড়ে তুলেছে। ড্রাগন বাহিনীর এই একপাক্ষিক দখলদারির ফলে গত ছয় বছর ধরে ওই ভারত নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থানীয়দের চাষাবাদ, ঐতিহ্যবাহী বনজ সম্পদ সংগ্রহ এবং পশুচারণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
নাহ আদিবাসীদের সংগঠন ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র সভাপতি কেরু চাদের এই বিষয়ে আপার সুবানসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দিয়েছেন। কেরু চাদের গণমাধ্যমকে বলেন:
“ওই জমি আমাদের পূর্বপুরুষদের। সেখানে বহু যুগ ধরে আমাদের মানুষেরা অবাধে শিকার, পশুচারণ এবং জুম চাষ করেছেন। কিন্তু কয়েক বছর আগেও যেসব জমিতে আমরা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে অবাধে চলাচল করতাম, সেগুলো এখন চীনা সামরিক বাহিনীর ভারী বুটের তলায় চলে গেছে।”
৫টি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এখন চীনের কব্জায়:
স্মারকলিপির তথ্য অনুযায়ী, এলএসি লাগোয়া আপার সুবনসিরি জেলার তাকসিং রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে চীনা সামরিক বাহিনী স্থায়ী পরিকাঠামো ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেছে। এলাকাগুলো হলো:
আসফিলা এলাকার ওয়িং ও পনিয়ার (চুজার্তা এলাকা)
মারপান
পোত্রাং * টিনডিংতাং
উল্লেখ্য, আদিবাসীদের বেদখল হওয়া এসব অঞ্চলের কয়েকটি স্থানকে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবেও বিবেচনা করেন।
কেরু চাদের জানান, প্রায় ১২ বছর আগে (২০১৪ সাল) থেকেই মাঝেমধ্যে ওই এলাকাগুলোতে চীনের লাল ফৌজ টহল দিতে ঢুকে পড়ত এবং ভারতীয় জওয়ানদের অনুপস্থিতি দেখে চলে যেত। কিন্তু ২০২০ সালে যখন লাদাখে গালওয়ান সীমান্ত সংঘাত চরম রূপ নেয়, ঠিক সেই সুযোগে তারা পূর্ব সীমান্তে কৌশলগতভাবে এই পাঁচ অঞ্চলের ভূখণ্ডগুলো নিজেদের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণে নেয়। কার্যত ওই সময় থেকেই স্থানীয় ভারতীয় গ্রামবাসীদের সেখানে যেতে অস্ত্র উঁচিয়ে বাধা দিচ্ছে চীনা বাহিনী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তাকসিং এলাকায় চীনা সামরিক বাহিনীর তৎপরতার গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের নিজেদের মাতৃভূমি হারাচ্ছি।”
এই বিষয়ে স্থানীয় নাচো এলাকার বিধায়ক নাকাপ নালো বলেন, বিষয়টি সরাসরি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই আদিবাসী সংগঠনের তোলা অভিযোগগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ও সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে এই স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়তেই নড়েচড়ে বসেছে দিল্লির সাউথ ব্লক। তবে ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই অনুপ্রবেশের দাবি সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনা জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনের সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ এবং ঘাঁটি স্থাপনের অভিযোগ করে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল, বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন। এছাড়া জেলা প্রশাসন বা অরুণাচল প্রদেশ সরকার এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
প্রসঙ্গত, বছর কয়েক আগে লাদাখেও একইভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে স্থানীয় পশুপালকদের বাধা দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তবে সে সময়ও ভারতের কেন্দ্রীয় মোদি সরকার দাবি করেছিল, লাদাখে ভারতের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও চীন দখল করতে পারেনি, যা নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেই বিরোধী দলগুলো তীব্র সমালোচনা করেছিল। অরুণাচলের আদিবাসীদের এই স্মারকলিপি ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বিতর্ককে আবারও উসকে দিল।

