সব ধরনের আইনি বাধা, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে চলতি বছরই বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর দেশে ফেরা কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অবরুদ্ধ গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অংশ।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগের পর এই প্রথম তিনি কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের প্রত্যাবর্তন ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এত বিস্তারিত খোলামেলা কথা বললেন।
বিগত প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও বর্তমানে নিষিদ্ধ।
এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন: “আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না, করি এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। আমার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কোনো ন্যায়বিচারের অংশ নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়া। বিচারব্যবস্থাকে প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানিয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্যবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবারই আমি মানুষের শক্তিতে বেঁচে ফিরেছি, এবারও সব ষড়যন্ট পার করে এ বছরই আমি আমার দেশে পা রাখব।”
দলের সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা কড়া ভাষায় বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে বা ক্ষণস্থায়ী সংগঠন নয়; এটি বাংলার মাটি, মানুষ, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ৭৭ বছরের একটি প্রাচীন রাজনৈতিক শক্তি। দলটির পুনরুত্থান অন্য কোনো দলের দুর্বলতা বা কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না, বরং দেশের সাধারণ জনগণই এর মূল শক্তি। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন গোপনে ও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে, যা দলটির দ্রুত পুনর্জাগরণের স্পষ্ট লক্ষণ।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে উগ্রবাদের চাষ হচ্ছে এবং দেশের মূল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্রকে ধ্বংস করে এটিকে পাকিস্তানের ধাঁচের একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে গঠিত বিএনপি সরকারের আমলকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো আইনের শাসন নেই, অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও সুফি দরগাহসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত ভয়াবহ হামলা ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সফলতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর আমলে:
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.২৫% এবং মাথাপিছু আয় ২,৭৯৩ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% এবং চরম দারিদ্র্য ৫.৬%-এ নেমে এসেছিল।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল এবং নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৪৩.৪৪%-এ পৌঁছেছিল।
এছাড়া পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে দেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ রূপান্তরিত হয়েছিল।
রাজনীতিতে ফেরার জন্য বা দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো গোপন যোগাযোগ বা আঁতাত হচ্ছে কি না—এমন গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার সস্তা অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন দর-কষাকষির বিষয় হতে পারে না।”
ভারতে অবস্থান করলেও ব্যক্তিগত জীবন বলতে এখন তাঁর কিছু নেই উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর মন ও হৃদয় ২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশেই পড়ে থাকে, যেখানে তাঁর পিতার সমাধি ও পরিবারের রক্ত মিশে আছে। তিনি দূর থেকেই প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের খোঁজ নিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরছেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই আওয়ামী লীগ আবার স্বমহিমায় ঘুরে দাঁড়াবে।

