এম আব্দুল কাইয়ুম, (এম.এ/মানবাধিকারকর্মী)
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য রমজান এক মহিমান্বিত ও পবিত্র মাস। এই মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। রমজান শুধু রোজা রাখার নাম নয়; এটি মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। মহান আল্লাহ এই মাসকে রহমত (দয়া), বরকত (কল্যাণ) ও মাগফিরাত (ক্ষমা) দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন।
মানুষের জীবন ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা ও ভোগের চাপে ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আত্মা হারায় প্রশান্তি, মন হারায় সংযম। এই বাস্তবতায় রমজান এক আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণশালা—যা মানুষকে নতুন করে নিজেকে চিনতে, শুদ্ধ করতে ও গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
রহমতের দশক
রমজানের প্রথম দশ দিনকে বলা হয় রহমতের দশক। এই সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণা বর্ষণ করেন। মানুষ যখন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে রোজা পালন করে, তখন সে উপলব্ধি করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্ট। এই সহমর্মিতাই রহমতের প্রকৃত শিক্ষা। দান-সদকা, ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর অসীম দয়ার ছায়ায় আশ্রয় নেয়।
বরকতের দশক
রমজানের মধ্যবর্তী দশ দিন বরকতের। এ সময় আল্লাহ বান্দার আমলকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেন। অল্প আমলেও অনেক সওয়াব লাভ হয়। কুরআন তিলাওয়াত, তারাবির নামাজ, জিকির-আজকার—সবই মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। এই বরকত শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে।
মাগফিরাতের দশক
রমজানের শেষ দশ দিন মাগফিরাতের—ক্ষমা লাভের সুবর্ণ সুযোগ। এই সময় রয়েছে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। মানুষ তার অতীত ভুল ও পাপের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইতিকাফ, গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ এবং কান্নাভেজা দোয়া—সবই আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে।
রমজানের সামাজিক শিক্ষা
রমজান মানুষকে সংযম ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়। এটি ধনী-গরিবের ভেদাভেদ দূর করে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। ইফতারের সময় সবাই একসাথে বসে খাওয়া—সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। রমজান আমাদের শেখায় কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়।
রমজান মানুষের জীবনে কেন প্রয়োজন?
রমজান মানুষের ভেতরের খারাপ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ ধৈর্য, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করে। এটি শুধু শারীরিক সংযম নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা ও হৃদয়েরও সংযম। ফলে মানুষ তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের পথে এগিয়ে যায়।
রমজান মানুষকে মিথ্যা, গীবত, হিংসা ও অহংকার থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। রোজা শুধু খাবার থেকে বিরত থাকা নয়; এটি অন্যায় ও পাপ থেকেও বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। এভাবে রমজান ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রকে শক্তিশালী করে তোলে।
ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করলে মানুষ দরিদ্রের দুঃখ বুঝতে পারে। তাই রমজানে যাকাত, ফিতরা ও দান-সদকার গুরুত্ব বাড়ে। সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় রমজান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বছরের অন্য সময় মানুষ নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না। রমজান সেই সুযোগ এনে দেয়। মানুষ নিজের অতীত ভুলের জন্য তওবা করে এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার সংকল্প নেয়। এটি এক ধরনের আত্মজাগরণ।
ইফতার ও তারাবির নামাজ পরিবার ও সমাজকে একত্রিত করে। একসাথে ইবাদত ও ইফতার মানুষে মানুষে সম্পর্ক মজবুত করে। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রমজান মিলনের বার্তা দেয়।
শেষকথা
রমজান রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের অনন্য সমন্বয়। এটি কেবল একটি মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের প্রশিক্ষণকাল। যদি আমরা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবন হবে শান্তিময় ও কল্যাণময়।
এবং মানুষের জীবনে রমজান প্রয়োজন কারণ এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, চরিত্রকে দৃঢ় করে এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে। রমজান আমাদের শেখায়—জীবনের প্রকৃত সফলতা ভোগে নয়, বরং সংযম, দয়া ও আল্লাহর নৈকট্যে।

