প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির মাঝে মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটারের এক বিন্দু—নাউরু। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ। কিন্তু আজ? আজ নাউরু পৃথিবীর সবচেয়ে স্থূল ও রোগাক্রান্ত মানুষের দেশ, যাদের মাটি খুঁড়ে বের করে নেওয়া হয়েছে প্রাণ আর সমুদ্রকে করা হয়েছে বিষাক্ত।
খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে থেকেই নাউরুতে মানুষের বসবাস। তখন কর্পোরেট কৃষির কোনো বালাই ছিল না, ছিল না কোনো প্যাকেটজাত খাবার। সমুদ্র ছিল তাদের অফুরন্ত ভাণ্ডার। পুরুষেরা হারপুন দিয়ে শিকার করত টুনা, অক্টোপাস আর কাঁকড়া। দ্বীপের সামান্য উর্বর জমিতে ফলত নারকেল, কলা আর ব্রেডফ্রুট। নাউরুবাসীরা ছিল পুরোপুরি স্বনির্ভর, প্রকৃতি আর মানুষের এক অপূর্ব মিতালীতে চলত তাদের জীবন।
নাউরুর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে ১৮৯৯ সালে। ড. অ্যালবার্ট এলিস আবিষ্কার করেন যে, দ্বীপের সেই সাদা-হলদে পাথর আসলে কয়েক হাজার বছর ধরে জমে থাকা সামুদ্রিক পাখির মল বা ‘গুয়ানো’। যা সময়ের বিবর্তনে খনিজ হয়ে বিশ্বের অন্যতম উচ্চমানের ফসফেটে পরিণত হয়েছে। আধুনিক কৃষিতে সারের জন্য তখন এই ফসফেটের আকাশচুম্বী চাহিদা। শুরু হলো খনন, শুরু হলো নাউরুর মাটির বুক চিরে সম্পদ বের করে নেওয়ার মহোৎসব।
১৯৬৮ সালে স্বাধীনতার পর নাউরু নিজেই ফসফেট রপ্তানি শুরু করে। সত্তরের দশকে নাউরুর মাথাপিছু আয় ছিল বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। দ্বীপের মানুষ প্রাচীন দক্ষতা ভুলে বিলাসিতায় গা ভাসাল। মাছ ধরা বা ফল চাষের বদলে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ল আমদানিকৃত প্যাকেটজাত খাবারে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে যখন ফসফেটের মজুদ ফুরিয়ে এল, তখন দেখা গেল এক ভয়াবহ চিত্র:
ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূমি: দ্বীপের ৮০ শতাংশ জমিই এখন ব্যবহারের অযোগ্য। রয়ে গেছে শুধু কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা চুনাপাথরের খাঁজ। ফসফেট প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য সমুদ্রে ফেলে ধ্বংস করা হয়েছে কোরাল রিফ ও মাছের আবাস।
অর্থনৈতিক ধস: ভুল বিনিয়োগ আর দুর্নীতির কারণে জমানো অর্থও শেষ হয়ে যায়। এককালের ধনী দেশ রাতারাতি পরিণত হয় দরিদ্র দেশে।
নাউরু আজ এক অদ্ভুত সংকটে। নিজেদের উৎপাদন করার মতো মাটি নেই, সমুদ্রও আর আগের মতো উজাড় করে দেয় না। ফলে তারা এখন পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রসেসড ফুডের ওপর নির্ভরশীল। ফলাফল? নাউরুর ৯৫ শতাংশ মানুষ এখন স্থূল এবং প্রায় অর্ধেক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
নাউরুর এই করুণ পরিণতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে আসা ‘উন্নয়ন’ আসলে টেকসই নয়। নাউরু মাত্র কয়েক দশকে ধ্বংস হয়েছে বলে আমরা তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই যেন কমবেশি একই পথে হাঁটছে। আমরাও কি উন্নয়নের নামে নিজেদের স্বনির্ভরতার শেকড় কেটে দিচ্ছি না? নাউরুর গল্পটি আসলে কোনো রূপকথা নয়, বরং প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মম ‘মাতবরি’র এক ভয়াবহ দলিল।

