মোঃ এ কে নোমান, নওগাঁ প্রতিনিধি:
অপরিপক্ব আম বাজারজাত ঠেকাতে এবং ভোক্তাদের নিরাপদ ও পরিপক্ব আম নিশ্চিত করতে নওগাঁ জেলা প্রশাসন চলতি মৌসুমের আম সংগ্রহের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, আগামী ২২ মে থেকে জেলায় আম সংগ্রহ শুরু হবে। ওই দিন থেকে স্থানীয় জাতের গুটি আম সংগ্রহ করা যাবে। আর জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক উৎপাদিত আম্রপালি আম বাজারে আসবে ১৫ জুন থেকে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া নওগাঁর বিখ্যাত নাক ফজলি আম সংগ্রহ শুরু হবে ৫ জুন।
রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত “নওগাঁ জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতওয়ারী আম সংগ্রহের সময় নির্ধারণী সভা” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। সভায় আমচাষি, ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২২ মে থেকে গুটি বা স্থানীয় জাতের আম, ৩০ মে থেকে গোপালভোগ, ২ জুন খিরসাপাত বা হিমসাগর, ৫ জুন নাক ফজলি, ১০ জুন ল্যাংড়া ও হাঁড়িভাঙা, ১৫ জুন আম্রপালি, ২৫ জুন ব্যানানা ম্যাঙ্গো ও ফজলি এবং ৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা, বারি আম-৪, গৌড়মতি ও কাটিমন আম সংগ্রহ করা যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১২ দশমিক ৭৮ টন উৎপাদনের হিসাব ধরে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৬১ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে বলে আশা করছে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ।
সভায় জানানো হয়, এ বছর নওগাঁ থেকে ২০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন আমবাগানগুলোতে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) বাস্তবায়নে কাজ করছে। পাশাপাশি সময়ের আগে আম সংগ্রহ ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত, চেকপোস্ট ও বিশেষ তদারকি দল সক্রিয় থাকবে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে প্রচারণাও চালানো হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি আমের জাত পরিপক্ব হওয়ার নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। এর আগে আম সংগ্রহ করলে স্বাদ ও গুণগত মান কমে যায়, যা বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৮ সাল থেকে নওগাঁর আম ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।
জানা গেছে, নওগাঁয় উৎপাদিত আমের প্রায় ৬০ শতাংশই আম্রপালি জাতের। এছাড়া নাক ফজলি, বারি আম-৪, গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোও ব্যাপকভাবে চাষ হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “নির্ধারিত সময়ের আগে কোনোভাবেই অপরিপক্ব আম সংগ্রহ বা বাজারজাত করা যাবে না। তবে আবহাওয়াজনিত কারণে আম আগে পরিপক্ব হলে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে সময় পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আম পাকানো, সংরক্ষণ কিংবা বাজারজাত করতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না। ভেজাল প্রতিরোধে সাপাহার সদর বাজার, পোরশার নোচনাহার ও সারাইগাছিসহ গুরুত্বপূর্ণ আমের বাজারগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে।”
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল বলেন, “ভোক্তাদের নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত আম নিশ্চিত করতে জাতভিত্তিক সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে আম রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। গত বছর নওগাঁ থেকে প্রায় ১০০ মেট্রিক টন আম মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছিল। এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২০০ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে নওগাঁর আম রপ্তানি হয়। এবার আরও বেশি আম চীনে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।”

