সৌদি আরবের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ সম্প্রতি মদিনার আল-মাহদ প্রদেশে খননকার্য চালিয়ে ইসলামের প্রাথমিক যুগের এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন উন্মোচন করেছে। উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ পাথরের গায়ে খোদাই করা লেখা বা শিলালিপিগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাথরগুলোতে প্রাক-ইসলামিক কবিতা এবং সামুদ জাতির ভাষার পাশাপাশি অন্তত ৪৬৭টি ইসলামিক টেক্সট বা বার্তা পাওয়া গেছে, যা ইসলামের প্রথম যুগের সমাজ ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।
উদ্ধারকৃত বেশ কিছু পাথরে ইসলামের প্রথম যুগের খলিফাদের নাম এবং তাদের জন্য প্রার্থনাসূচক বাক্য খোদাই করা রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, এসব লিপি থেকে ধারণা করা যায় যে যার নাম লেখা হয়েছে, সেটি ছিল তার শাসনকাল। যেমন একটি পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে, “আল্লাহ হচ্ছেন এই দুনিয়ায় এবং আখিরাতে উমর ইবন আল-খাত্তাবের অভিভাবক।” অন্যান্য পাথরেও খলিফাদের নাম এবং তাওহিদের সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন লেখা স্থান পেয়েছে। আধুনিক কার্বন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে এই শিলালিপিগুলোর সঠিক সময়কালও নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।
কিছু পাথর বহন করছে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। উদাহরণস্বরূপ একটি পাথরের গায়ে লেখা আছে, “আমি আমর ইবনে রাবিয়া আল-সাকাফি। এবং আমি এটা লিখছি ইফ্রিকিয়া জয়ের বছরে।” তৎকালীন সময়ে ‘ইফ্রিকিয়া’ বলতে বর্তমান তিউনিসিয়া অঞ্চলকে বোঝানো হতো, যা মুসলমানরা হিজরি ২৭ সনে জয় করেছিল। এই আবিষ্কারগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সাল ও ঘটনার সত্যতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, কিছু কিছু শিলালিপি পরোক্ষভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের সহিহ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করছে। তেমনই একটি পাথরে খোদাই করা আছে, “আমি আল-ওয়ালিদ, আব্দুল্লাহ ইবনে দুই ডানাওয়ালা জাফরের মুক্ত দাস। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন।” ইসলামের ইতিহাসে মুতার যুদ্ধে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) যখন দুই হাত হারিয়ে শহিদ হন, তখন রাসুল (সা.) সাহাবিদের জানিয়েছিলেন যে আল্লাহ জান্নাতে জাফরের দুই হাতকে দুটো ডানা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে দিয়েছেন। এই লিপিতে জাফরের নামের সাথে ব্যবহৃত ‘দুই ডানাওয়ালা’ উপাধিটি মূলত সেই হাদিসেরই একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক রেফারেন্স।
এছাড়াও উদ্ধারকৃত পাথরগুলোর কোনো কোনোটিতে সুরা এখলাস এবং সুরা নাসরের মতো ছোট ছোট সুরা খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ পাথরেই খোদাই করা ছিল আত্মস্বীকৃতি ও ক্ষমার প্রার্থনা, যেমন— “আমি অমুক। নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।” বর্তমান যুগে পাহাড় বা দেওয়ালে মানুষের অর্থহীন লেখালেখির অভ্যাসের বিপরীতে ইসলামের শুরুর যুগের মানুষের চিন্তাভাবনা, তাওহিদের প্রতি বিশ্বাস এবং পরকালের প্রতি আকুলতা কতটা গভীর ছিল, এই আবিষ্কারগুলো তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

