কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (কুড়িকৃবি) প্রতিষ্ঠা ছিলো কুড়িগ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। এটি ছিলো তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও প্রত্যাশার ফসল, যা কুড়িগ্রামের শিক্ষার অগ্রযাত্রায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কুড়িগ্রামবাসী প্রত্যাশা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি কার্যকর, গতিশীল ও মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রায় পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এখানে একজনও স্থায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দুই সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান এবং পরবর্তী তৃতীয় ব্যাচের ভর্তি কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির দুইটি অনুষদের (কৃষি ও ফিশারিজ) শিক্ষা কার্যক্রম অ্যাডহক ভিত্তিক শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না হয়েও অন্য বিষয়ের শিক্ষক দ্বারা কোনরকমে পাঠদান শেষ করা হচ্ছে যা শিক্ষার্থীদের শুধু ক্ষতিগ্রস্তই করছে না বরং প্রকৃত শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও চরম হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও অ্যাডহক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান ভাইস-চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি পাবিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার পবিবারের মধ্যে আপন বোনের ছেলে সেকশন অফিসার (পিএ টু ভিসি) আতিকুল ইসলাম, আপন বোনের মেয়ে কম্পিউটার টাইপিস্ট রেজবিন আক্তার, আপন শ্যালক সেকশন অফিসার (সিকিউরিটি/ পরিকল্পনা) আব্দুল্লাহ সোহাগ, আপন বোনের ছেলে সেকশন অফিসার (পরীক্ষা বিভাগ) মোস্তফা সরকার, আপন বোনের মেয়ে সেকশন অফিসার (খামার) জান্নাতুল ফেরদৌস, ফুপু শ্বশুরের ছেলে প্রভাষক রাইয়্যান রেজা, আপন ফুপাত ভাইয়ের ছেলে কম্পিউটার টাইপিস্ট রায়হান সরকারসহ অনেককে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে অ্যাডহক নিয়োগ দিয়েছেন (মোট ৪৫ জন এর বেশী) এবং সামনে আরও এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারা করছেন।
সচেতন মহল বলছেন, ভিসি প্রফেসর রাশেদুল এরকম নিয়োগ বোর্ড ছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে একক এখতিয়ারে নিয়োগ দিয়েছেন যা বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরী কমিশনের নিয়মের পরিপন্থী। এ সমস্ত নিয়োগ ছাড়াও লোক মুখে জানা যায় যে, আগামীতে নিয়োগের জন্য ২৫ কোটি এর অধিক টাকার নিয়োগ বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে। আপন শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগ বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ভয়ে সমস্ত কর্মকর্তা এবং কর্মচারী সব সময় তটস্ত থাকে এবং তিনি নিয়মিত অফিস করেন না বলে জানা গেছে।
তদন্তের ভয়ে ভিসি রাশেদুল সমস্ত ব্যক্তিগত ফাইল রেজিস্ট্রার কায়ালয়ের পরিবর্তে নিজের কাছে রেখেছেন। এরকম অবৈধ নিয়োগের ফলে কুড়িগ্রাম এলাকার জনগণ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। সেইসাথে দরখাস্ত করার যোগ্যতা না থাকা সত্বেও অত্যন্ত চাতুরতার সাথে তার স্ত্রীকে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পাইয়ে দিয়েছেন।
অভিযোগ আছে, ভাইস-চ্যান্সেলর ধারাবাহিকভাবে ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকেন না যা অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। দেখা গেছে, গত ১ জুন ২০২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৩৩৩ দিনের মধ্যে মাত্র ৪২ দিন কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন তিনি। অন্যান্য দিনগুলোতে ঢাকায় অবস্থান এবং সরকারি গাড়ী ব্যবহার করেছেন। তিনি গড়ে মাসে ৩ থেকে ৪ দিন বা তারও কম ক্যাম্পাসে আসেন বলে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন এবং ফটোসেশন করার জন্য তিনি আসেন। আবার অফিসে আসলেও এক দুই ঘন্টা অবস্থান করে চলে যান। বেশিরভাগ সময় তিনি বিভিন্ন কাজের অজুহাতে ঢাকায় অবস্থান করেন। অথচ মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ভাইস-চ্যান্সেলর সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে থাকবেন। বাস্তবে এ যেন আর এক কলিমুল্লাহ (বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য) যুগের আবির্ভাব।
ঢাকার গেস্ট হাউজকে তিনি তার মূল অফিস বানিয়েছেন, যা ইউজিসি-এর নিয়মের পবিপন্থী। তিনি অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামী সহ সকল দলের নেতাদের সাথে লিয়াজো করে চলতেন। ইতিমধ্যে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নিয়েও তিনি লুকোচুরি খেলেন। এছাড়া ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা যেনতেনভাবে রিপোর্ট দিয়ে পুরো টাকা হাতিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে তিনি খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটার ক্ষেত্রে ছলছাতুরি করে অখ্যাত কোম্পানীর নামে বেশী দামে নিম্নমানের পণ্য ক্রয় করে থাকেন। বিগত তিনটি ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত টাকার সামান্য কিছু অংশ ব্যয় করে বাকি সমস্ত টাকা একাই লোপাট করেছেন।
ঢাকায় বসে ব্যাপকভাবে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি, হয়রানি, আর স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যাচ্ছেন ভিসি রাশেদুল ইসলাম। তার লাগাতার অনুপস্থিতির কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়েই এমন নাজুক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। এমতাবস্থায়, সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বাঁচাতে হলে এই দুর্নীতিবাজ ভাইস-চ্যান্সেলরকে অপসরণ করার কথা এবং তার দুর্নীতি যথাযথ তদন্ত করতে হবেও বলে জানান কুড়িগ্রামবাসী।

