জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পে সামান্য কাজ হলেও ২৫-৩০ শতাংশ অর্থ চলে যায় পিআইওর পকেটে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
জনপ্রতিনিধিদের দাবি, জনপ্রতিনিধিদের জিম্মি করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ওবায়দুল হক ২০-২৫ শতাংশ কমিশন নেন। না দিলে প্রকল্পের বিলে স্বাক্ষর করেন না তিনি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১ম, ২য় ও ৩য় পর্যায়ে ক্ষেতলাল উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-কাবিটা) খাতে ১০৪ টি প্রকল্পের আওতায় কাবিটা (নগদ) খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৮ টাকা, কাবিখা (চাল) খাতে বরাদ্দ ছিল ৭৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন, একই পরিমাণ অর্থাৎ ৭৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয় কাবিখা (গম) খাতে, অন্যদিকে টিআর (নগদ) খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯০৯ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ও ২য় পর্যায়ে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে কাবিটা (নগদ) খাতে ৮৬ টি প্রকল্পের বিপরীতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫৬০ টাকা ৭৮ পয়সা, কাবিখা (চাল) খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৫০ দশমিক ৫৩৪৭ মেট্রিক টন, একই পরিমাণ অর্থাৎ ৫০ দশমিক ৫৩৪৭ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয় কাবিখা (গম) খাতে, অন্যদিকে টিআর (নগদ) খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ টাকা ৮২ পয়সা।
গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর বিল ফাইল জিম্মি করে ঘুষ দাবি করলে তাঁরাসহ (ইউপি চেয়ারম্যানরা) প্রকল্প সভাপতিরা তাঁকে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে ২৫ শতাংশ নগদ অর্থ ঘুষ দিতে বাধ্য হন। এ ছাড়া প্রকল্পগুলোতে ভ্যাট ও আয়কর বাধ্যতামূলক না থাকলেও সেটার জন্য তিনি প্রতিটি প্রকল্পের বিল থেকে ১৫ শতাংশ (১০ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আয়কর) টাকা কেটে রেখে নিজে আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রকল্পে বাস্তব কাজ খুবই সীমিত বা নামমাত্র হলেও পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করা হচ্ছে। রাস্তা সংস্কার, মাটি ভরাট, খাল খনন ও মসজিদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দের বড় অংশই আত্মসাৎ হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে রাস্তা সংস্কার, মাটি ভরাট, খাল পুনঃখনন এবং মসজিদ উন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে। তবে এসব প্রকল্পের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজের তুলনায় বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তে দেখা যায়, ইস্টিমেট প্রণয়নের সময় কাজের পরিধি ও ব্যয় অতিরঞ্জিতভাবে দেখানো হলেও বাস্তবায়নের সময় খুব সামান্য কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে অল্প কাজ করেই পুরো বরাদ্দ উত্তোলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে রাস্তা ও খাল সংস্কারের ক্ষেত্রে সামান্য কাজকে বড় কাজ হিসেবে দেখিয়ে ইস্টিমেট করা হয় এবং পরবর্তীতে সীমিত কাজ সম্পন্ন করে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অল্প কিছু ইট বা মাটি ফেলে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন চোখে পড়েনি।
এছাড়াও কিছু প্রকল্পে কাজের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। তবুও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সম্পূর্ণ বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকেই।
বড়াইল ইউপি সদস্য সেকেন্দার আলী বলেন, ভাই আমি কিভাবে কাজ করবো বলেন? আমার যা বরাদ্দ তার মধ্যে পিআইও অফিসে অফিস খরচ বাবদ ১৫% হিসেবে দিতে হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। পিআইও পরিবার নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার সময় আবার নিয়েছে ৫ হাজার টাকা। সেখান থেকে আবার পরিষদে দিয়েছি ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। তাহলে কিভাবে কাজ করবো বলেন? তাও আপনি যাওয়ার পর আরও ১০০ মিটার কাজ নতুনভাবে করে দিতে হয়েছে।
আরেক ইউপি সদস্য রুবেল হোসেন বলেন, আমরা মিটিংয়ে থাকি না। পিআইও চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা যেভাবে বলে, সেভাবেই কাজ করতে হয়। না হলে বিলও পাওয়া যায় না, বরাদ্দও কমে যায়।
সংরক্ষিত নারী সদস্য আশা বেগম বলেন, আমি প্রকল্পের সভাপতি হলেও কাজ করেছে চেয়ারম্যান ও পিআইও। আমি কিছু বলতে পারবো না। আপনার কিছু জানার থাকলে তাদের সাথে কথা বলুন।
তুলসীগঙ্গা ইউপি সদস্য মনোয়ার হোসেন বলেন, পিআইওর দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ক্ষেতলাল উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। টাকা ছাড়া তিনি কিছু বোঝেন না।
বড়াইল ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান বাবু বলেন, পিআইওকে ১৫ শতাংশ, আবার অফিসসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ২০-২৫ শতাংশের বেশি চলে যায়। আমি প্রতিবাদ করায় আমাদের ইউনিয়নে বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে।
আলমপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হোসনে আরা অভিযোগ করেন, প্রতিটি কাজেই ১৫-২০ শতাংশ দিতে হয়। না দিলে বিলে স্বাক্ষর করে না। যারা আগে টাকা দেয়, তারাই আগে বিল পায় ও বেশি বরাদ্দ পায়। মহিলা মানুষ বলে বেশি কিছু বলতেও পারিনা।
তুলসীগঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের একটি মিটিংয়ে এক ইউপি সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্যানেল চেয়ারম্যান শহিদ খান জানান, প্রতিটি প্রকল্প থেকে পিআইও অফিসে দিতে হয় ১৫ পারসেন্ট এবং অন্যান্য খরচ ৩ পারসেন্টসহ মোট ১৮ পারসেন্ট যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওবায়দুল হক বলেন, এভাবে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। কেউ বলে থাকলে ভুল বলেছে। বলেই তিনি মিটিং এ আছি বলে ফোন কেটে দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক(সুজন) জয়পুরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, এইরকম অনিয়ম দুর্নীতি কখনই কাম্য নয়! এসব সত্য হলে এর প্রতিকার হওয়া জরুরী।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা চৌধুরী বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা (অতি. দা.) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমি এনডিসির দায়িত্বে আছি। গত বৃহস্পতিবার আমাকে এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মাত্র একদিন অফিস করেছি। এসব বিষয়ে আমার জানা নাই। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ‘পারসেন্টেজ নির্ভর’ ব্যবস্থার কারণে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

