ইরানের নাজাঞ্জ মরুভূমির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক দানবীয় পাহাড়—’কুহ-ই কোলাং গাজ লা’ বা পিক্যাক্স মাউন্টেন। ওপর থেকে দেখলে এটি কেবল একটি রুক্ষ ধূসর পাহাড় মনে হতে পারে, কিন্তু এর অন্দরে লুকিয়ে আছে এমন এক প্রযুক্তিগত বিস্ময় এবং সামরিক সুরক্ষা, যা বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং ইরানের পারমাণবিক স্বপ্নকে মাটির গভীরে অমরত্ব দেওয়ার এক দুঃসাহসী প্রচেষ্টা।
১. প্রকৃতির এক দুর্ভেদ্য ঢাল: গ্রানাইট পাথরের মহিমা
পিক্যাক্স মাউন্টেনের মূল শক্তি এর ভূতাত্ত্বিক গঠন। এটি অত্যন্ত শক্ত এবং নিরেট গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত, যা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পাথর।
প্রাচীনত্ব: এই গ্রানাইট প্রাক-ক্যামব্রিয়ান বা প্যালিওজোয়িক যুগের, অর্থাৎ এটি প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি বছর পুরনো।
প্রাকৃতিক সুরক্ষা: মানুষের তৈরি যেকোনো উচ্চমানের কংক্রিটের চেয়ে প্রাকৃতিক গ্রানাইট অনেক বেশি শক্তিশালী এবং চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এটি প্রাকৃতিকভাবেই বাঙ্কার-বাস্টার বোমা থেকে সুরক্ষা দেয়।
২. মার্কিন ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ যখন ব্যর্থ
আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা GBU-57 MOP বড়জোর ২০০ ফুট কংক্রিট ভেদ করতে পারে। কিন্তু ইরানের এই কেন্দ্রটি পাহাড়ের প্রায় ২,০০০ ফুট (৬০০ মিটার) গভীরে অবস্থিত!
আধুনিক প্রযুক্তির কোনো বোমার পক্ষেই এই গভীরতায় পৌঁছে আঘাত করা প্রায় অসম্ভব।
গভীরতার কারণে পারমাণবিক বিস্ফোরণের সরাসরি প্রভাবও এর ভেতরে থাকা সরঞ্জামের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
৩. নিরাপত্তা বেষ্টনী: সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর চিত্র
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ইমেজ (সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী, এই দুর্গকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়:
বিশাল দেওয়াল: পাহাড়ের গোড়ায় প্রায় ৪,০০০ ফুট লম্বা একটি নিরাপত্তা দেওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।
ডাবল-পেরিমিটার: দেওয়ালের পেছনে রয়েছে বিশেষ কাঁটাতারের বেড়া (Fence), যা পুরো এলাকাটিকে একটি হাই-টেক ইলেকট্রনিক নজরদারি জোনে পরিণত করেছে।
৪. পাহাড়ের ভেতরে এক অন্য জগৎ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের ভেতরে রয়েছে বিশাল সব হলঘর, যা আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়। এর অভ্যন্তরে রয়েছে:
উন্নত সেন্ট্রিফিউজ: হাজার হাজার আইআর-৬ বা তার চেয়ে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ বসানোর ব্যবস্থা।
স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা: নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পানি সরবরাহ এবং ছদ্মবেশে ঢাকা বিশাল সব ভেন্টিলেশন শ্যাফ্ট।
টানেলের গোলকধাঁধা: পাহাড়ের ভেতর এমনভাবে টানেল তৈরি করা হয়েছে যা শত্রুসেনাদের বিভ্রান্ত করতে যথেষ্ট।
৫. লজিস্টিকস ও কৌশলগত প্রবেশপথ
পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে চার জোড়া বিশাল প্রবেশপথ রয়েছে। মাটির নিচেই রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম অতি দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। হামলার সংকেত পেলেই এই প্রবেশপথগুলো বিশাল কংক্রিটের ব্লকের নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
“The Unstoppable Fortress”
ফোরদোর পর ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ হলো ইরানের চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা। বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন “দ্য আনস্টপেবল ফোরট্রেস” বা অপ্রতিরোধ্য দুর্গ। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ এখানেই মজুদ আছে এবং এখান থেকেই ইরান চূড়ান্তভাবে পারমাণবিক শক্তির মালিক হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর জন্য এটি এখন এক অমীমাংসিত ধাঁধা।

