শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
প্রতি বছরের মত এবারও ঈদুল আজহা তথা কুরবানি উপলক্ষে সৈয়দপুর থেকে শতাধিক কসাই ঢাকায় যাচ্ছেন। দশই জ্বিলহাজ্ব এর আগেই তারা পাড়ি জমাবেন রাজধানীতে। ইতোমধ্যে অনেকে চলে গেছেন সড়ক ও রেলপথে। বাকিরা যাবেন ঈদের আগের দিন আকাশপথে।
মূলত: কুরবানির পশু জবাই ও কাটার কাজ করে বাড়তি আয়ের জন্যই তাদের এই যাত্রা। ঈদের কয়েকটি দিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরু বানানোর কাজ শেষ করে তাঁরা নিজ শহর সৈয়দপুরে ফিরবেন। আবার শুরু হবে তাদের পুরোনো জীবনের ব্যস্ততা।
ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুর শহরের গোশত পট্টিতে শুরু হয় অন্য রকম ব্যস্ততা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হাটের কোলাহলের পাশাপাশি বেড়েছে কসাইদের ঢাকামুখী প্রস্তুতি। নিয়মিত কাজের ফাঁকেই কুরবানির জন্য দলবদ্ধভাবে বাড়তি হাতিয়ার শান দিয়ে ধার করার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
কসাইরা পৃথক কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে যান। প্রতিটি দলের নেতৃত্বে থাকেন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ একজন। গত কয়েক দিনে ইতোমধ্যে ২০ টি দলে প্রায় ৬০-৭০ জন বাস ও ট্রেনে পৌঁছেছেন ঢাকায়। সোমবার (২৫ মে) রাতেও ২০ জনের ৫টি দল নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনে রওয়ানা দিয়েছেন।
এসব দলের মূল সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দপুর গোশত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাদিম কোরাইশী ওরফে ছোটু কসাই। ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাবেন তিনি। টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।
নাদিমের মতো এই কসাইদের বড় একটি অংশ উর্দুভাষী। বংশ পরম্পরায় মাংস ব্যবসা ও কসাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। সৈয়দপুর পৌর গোশত হাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী ও খয়রাত হোসেনও যাচ্ছেন পৃথক দল নিয়ে। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি থেকে তাঁরাও বিমানের টিকিট কিনেছেন।
নাদিম কোরাইশী বলেন, আমাদের বাপ-দাদারাও কুরবানির ঈদে ঢাকায় কাজ করতে যেতেন। এখনো মানুষ আমাদের ডাকেন। চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে মাংস পিস করা, হাড় আলাদা করা—সব কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই এসব কাজ শিখে বড় হয়েছি আমরা। পশু জবাই ও মাংস কাটায় আমাদের আলাদা দক্ষতা আছে। তাছাড়া এই কাজ একটা শিল্পও বটে। এই শিল্পের ক্ষেত্রে সৈয়দপুরের কসাইদের বিশেষ নৈপুণ্যতার
কারণে ঢাকায় তাঁদের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাবার হাত ধরে কসাইয়ের কাজে নামা। প্রায় ৩০ বছর থেকে একাজে নিয়োজিত। প্রথম থেকেই প্রতি ঈদেই ঢাকায় যান। রাজধানীর অভিজাত অনেক পরিবারের বাড়িতে কাজ করেছেন। একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকার বাসাতেও কোরবানির গরু জবাই করেছেন।
গত বছর চার সহযোগী নিয়ে ঢাকায় ১২টি গরু জবাই করেছিলেন। সব মিলে আয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। সহযোগীদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেন। যাতায়াত খরচও নিজেই বহন করেন। এবার সদস্য বেড়ে হয়েছে ১০ জন। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে কাজ করার পরিকল্পনা। ইতিমধ্যে অনেক পরিবারই তাঁদের বুকিং দিয়ে রেখেছে।
ছোটু কসাই আরও জানান, দলগতভাবে ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও নিজস্ব পরিচিতদের কাছে গিয়ে কাজ করেন। ঢাকার অনেক পরিবার এখন সৈয়দপুরের কসাইদের নাম ধরেই চেনেন। অনেকের মোবাইল নম্বরও সংরক্ষিত থাকে তাঁদের কাছে। সব মিলে এবার প্রায় শতাধিক কসাই ঢাকায় ছুটছেন।
কসাই ফজলে রাব্বি বলেন, ঈদের আগে ঢাকাগামী বিমানে যাত্রী কম থাকে। কারণ, তখন সবাই ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে আসেন। তাই বিমান কোম্পানিগুলো ভাড়া কমিয়ে দেয়। আমরা সেই সুযোগটা কাজে লাগাই। পরিবারের কথা চিন্তা করেই বাড়তি আয়ের আশায় তাদের ছেড়ে ঈদের সময়ও দূরে গিয়ে কাজ করি।
মো. মিন্টু কসাই বলেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়। কিন্তু আমরা বাড়তি টাকার আশায় ঢাকায় যাই। ঢাকায় মাংস কাটার রেট অনেক বেশি। সৈয়দপুরে ১ লাখ টাকা দামের একটি গরু বানিয়ে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অথচ ঢাকায় একই কাজের জন্য পাওয়া যায় ২০–২৫ হাজার টাকা। একজন অভিজ্ঞ কসাই ঈদের তিন দিনে অন্তত ১০টি গরুর মাংস কাটতে পারেন। ফলে তিন দিনের কাজ শেষে অনেকে ভালো অঙ্কের আয় করে বাড়ি ফেরেন।
সৈয়দপুর শহরের রেলওয়ে কারখানা গেট বাজারের কসাই মোস্তাকিম বলেন, আগে আমার বাবা ঢাকায় যেতেন। মূলত গুলশান-বনানীর বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করতেন। তিন বছর ধরে আমি বাবার দেওয়া ঠিকানায় যাচ্ছি। ওই অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঈদের পরে প্রায় এক দেড় মাস আমাদের ব্যবসা বন্ধ থাকে। কারণ এতদিন ঈদের গোশতই খায় মানুষ। তাই গরু জবাই করলে বিক্রি কম হয়। অনেক সময় লস হয়। এজন্য আমরা পশু জবাই করিনা। এই সময়টাতে ঈদের সময় ঢাকা থেকে আয়কৃত টাকায় আমরা চলি।

