২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলার আইনি প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়:
তদন্ত শুরু: ২৫ মার্চ ২০২৫
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
অভিযোগ গঠন (চার্জশিট): ২ নভেম্বর ২০২৫
সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু: ১ ডিসেম্বর ২০২৫ (রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ২ জন সাফাই সাক্ষী)
যুক্তিতর্ক শুরু ও শেষ: ১৩ এপ্রিল থেকে ১৩ মে ২০২৬
রায়ের দিন ধার্য: ২২ জুন ২০২৬
সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষ মোট ৮টি সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী ও উসকানিমূলক অপরাধের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিল, যার সবগুলোই শুনানিতে প্রমাণিত হয়েছে:
আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা ও উসকানি: ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের দমনে বলপ্রয়োগের উসকানি ও হত্যার নির্দেশ প্রদান।
১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ১৪-দলের সভায় যোগ দিয়ে আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) সিদ্ধান্তের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে প্ররোচনা।
ছবি দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার তালিকা তৈরি এবং তাঁদের অবৈধভাবে আটক ও নির্যাতন করতে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোনে নির্দেশ প্রদান।
আন্দোলন দমনে বেসামরিক এলাকায় মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিং (বোমাবর্ষণ) করার নীল নকশা তৈরি।
সরকারের চালানো গণহত্যা ও দমন-পীড়নকে গণমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে কৌশলে রাজনৈতিক সমর্থন ও বৈধতা দেওয়া।
১৪-দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
আন্দোলন দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত টেলিফোনে কথা বলে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা।
কুষ্টিয়ায় ৬ জনসহ দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী বাবু, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামের ছয় আন্দোলনকারীকে সরাসরি গুলিতে হত্যায় নির্দেশনা প্রদান। একই সাথে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার হুকুমের আসামি হওয়া।
আজ কড়া নিরাপত্তায় হাসানুল হক ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউশন পক্ষ স্বস্তি প্রকাশ করলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

