বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা ও বহুল আলোচিত চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর কবর থেকে তাঁর দেহাবশেষ (লাশ) তোলার যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করেছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত এই আদেশ দেন।
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আদালতে একটি বিশেষ আবেদন করার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক পূর্বের আদেশটি প্রত্যাহার করে নেন।
যেসব কারণে লাশ তোলার অনুমতি বাতিল করা হলো:
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান আদালতের এই আদেশ নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ ৩০ বছর পর লাশ উত্তোলন করার আইনি ও ধর্মীয় যৌক্তিকতা নিয়ে বাদীর তীব্র আপত্তি রয়েছে। আবেদনের মূল কারণগুলো হলো:
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: সালমান শাহর মরদেহ সিলেটের পবিত্র হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে। এত বছর পর কবর খুঁড়ে লাশ তোলা হলে তা ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানবে।
সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা: মাজার প্রাঙ্গণে লাশ উত্তোলনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভক্ত, জনতা ও মাজার কর্তৃপক্ষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ, বাধা এবং বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হতে পারে।
পরিবারের আপত্তি: সালমান শাহর মামা তথা মামলার বাদী মো. আলমগীর কুমকুম এবং মা নিলুফার জামান চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরী—উভয়েই এই লাশ উত্তোলনের বিষয়ে তীব্র আপত্তি ও অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ফলাফল শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা: চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বাস্তবতার নিরিখে, মৃত্যুর তিন দশক পর কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলন করে নতুন কোনো সুরতহাল বা ময়নাতদন্তের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশ পরিদর্শক মো. জিয়াউল মোর্শেদের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৪ মে আদালত সালমান শাহর লাশ কবর থেকে তোলার অনুমতি দিয়েছিলেন।
গত বছরের ২০ অক্টোবর মধ্যরাতে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এই মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন—
১. লতিফা হক লুসি (সামিরার মা)
২. আজিজ মোহাম্মদ ভাই (চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী)
৩. ডন (চলচ্চিত্রের খলনায়ক)
৪. ডেভিড
৫. জাভেদ
৬. ফারুক
৭. রুবী
৮. আ. ছাত্তার
৯. সাজু
১০. রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সাথে দেখা করতে যান। সে সময় স্ত্রী সামিরা এবং কর্মচারী আবুল জানান যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। পরে সালমানের বাবা-মা গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে যান।
এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের বাবাকে জানান, সালমানের ‘যেন কী হয়েছে’। খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় ছুটে গিয়ে দেখতে পান, সালমান শোবার ঘরে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছেন এবং রুবী নামের একটি মেয়ে সেখানে বসা ছিল। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, বেশ কিছুক্ষণ আগেই সালমান শাহ মারা গেছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পা নীলবর্ণ ধারণ করতে দেখেছিলেন স্বজনরা, যা এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ইঙ্গিত করে বলে মামলায় দাবি করা হয়।

