জীবিকার তাগিদে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিল ১৮ বছর বয়সী তরুণ জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাড়ি ফিরে তাকে মুখোমুখি হতে হলো এক অবর্ণনীয় ও লোমহর্ষক বাস্তবতার।
চিরচেনা ঘরে ফিরে সিফাত দেখতে পেল তার জন্মদাত্রী মা আর আদরের তিন বোনের রক্তাক্ত, নিথর দেহ। যে ঘরটি প্রতিদিন মুখরিত থাকত মায়ের স্নেহময় ডাক আর বোনদের খুনসুটিতে, আজ সেখানে কেবলই বিষাদের স্তব্ধতা আর রক্তে ভেজা স্বপ্নের লাশের স্তূপ।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) সকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দেনায়েতপুর এলাকায় এই পৈশাচিক ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সিফাতের মা শাহিনুর বেগম, বড় বোন সায়মা আক্তার, মেজো বোন ইকরা আক্তার এবং ছোট বোন শিফা আক্তার। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়।
এই হতভাগ্য পরিবারের বিপর্যয়ের শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০১৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে আকস্মিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। ফেরি করে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করে তিনি কোনোমতে সংসারের চাকা সচল রাখতেন। ভরসা হারানোর সেই কঠিন সময়ে হাল ছাড়েননি মা শাহিনুর বেগম।
একমাত্র ছেলে আর তিন কন্যাসন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। চরম অভাব-অনটনের মাঝেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। মায়ের এই লড়াইয়ে শামিল হয়ে বড় দুই সন্তানও ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে সংসারের হাল ধরতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
সব দুঃখ-কষ্ট পেছনে ফেলে পরিবারটি যখন নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছিল, ঠিক তখনই ঘাতকের আঘাতে এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল সব। রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সিফাত এখন আক্ষরিক অর্থেই পুরো পৃথিবীতে একা। বাবা, মা কিংবা তিন বোন—আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো আপনজন আর অবশিষ্ট নেই তার। সিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওমর ফারুক রনি জানান, সিফাতের ভাই-বোনেরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনার প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিল। এই একটি নির্মম ঘটনায় পুরো পরিবারটি এখন পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল।
নিহতরা গত কয়েক বছর ধরে রায়পুরের দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে আমির হোসেন মাস্টারের ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন। রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত তাদের একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে মাত্র আট হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। ঘটনার দিন সকালেও সে যথারীতি বাসা থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহতদের প্রত্যেকের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক মারাত্মক আঘাত ছিল। ঘাতকের নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, মেজো মেয়ের ফুসফুস পর্যন্ত বের হয়ে গিয়েছিল।
ঘটনার সময় আফরোজা বেগম রানী নামের এক প্রতিবেশী ঘাতক অন্তর মজুমদারকে ওই বাসায় সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে সেখানে আসার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তখন অন্তর নিজেকে পানির পাইপ মেরামতের মিস্ত্রি বলে দাবি করে। তবে রানী তার সেই কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে বাইরে থেকে ঘরের কলাপসিবল গেটটি আটকে দেন এবং দ্রুত প্রতিবেশীদের খবর দেন। প্রতিবেশী রানীর এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের কারণেই মূলত ঘাতক পালাতে পারেনি এবং খুনের রহস্য এত দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
দুপুরের দিকে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক হাসপাতাল এবং ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি ওই বাড়ির মালিক, অন্যান্য ভাড়াটিয়া এবং প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
পুলিশ সুপার জানান, তদন্তে জানা গেছে ঘাতক অন্তর তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই একই ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করত। তবে গত সাত-আট মাস আগে সে ওই বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। যেহেতু আগে থেকেই তাদের মধ্যে একটি জানাশোনা বা পূর্ব পরিচিতি ছিল, সম্ভবত সেই সুবাদেই অন্তর সকালে ওই বাসায় অনায়াসে প্রবেশ করতে পেরেছিল এবং পরবর্তীতে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তবে ঠিক কী কারণে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
বুকের ভেতর জমে থাকা পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সিফাত শুধু একটি প্রশ্নই বারবার আওড়াচ্ছে—তার মা আর বোনদের আসলে কী অপরাধ ছিল? এখন আর কার মুখের দিকে তাকিয়ে, কার জন্য সে বেঁচে থাকবে? সিফাতের এই বোবা কান্নায় রায়পুরের আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

