ফ্লোরিডা থেকে উধাও হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দুইজনই হত্যার শিকার হয়েছেন।যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা অনেক সময়েই মিডিয়া কভারেজ সেভাবে পায় না।এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। লিমন ও বৃষ্টিকে নিয়ে মার্কিন মিডিয়া সরব হয়েছে।
পুলিশ এরমধ্যেই এ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে “বিপজ্জনক” হিসেবে শ্রেণীভূক্ত করে তল্লাশি চালাচ্ছে।স্বদেশীরা সর্বত্র কায়মন বাক্যে চেয়ে আছেন যেকোনো সুখবরের জন্য।ফুটফুটে দুইটা জীবন নিয়ে কোন দু:সংবাদ কেউ শোনার জন্য প্রস্তুত নন।
প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়। কেউ ফেরে, কেউ ফেরে না। কারো নিখোঁজ হওয়ার পেছনে থাকে অপরাধের ছায়া। কারো পেছনে থাকে স্বেচ্ছায় লুকিয়ে পড়ার গল্প, আর কারো ক্ষেত্রে রহস্য এতটাই গভীর যে দশকের পর দশক কেটে গেলেও সত্য বেরিয়ে আসে না। আমেরিকার মাটিতে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার এই বাস্তবতা জটিল সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অপরাধমূলক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
ন্যাশনাল ক্রাইম ইনফরমেশন সেন্টার (NCIC)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রায় ছয় লক্ষ মানুষের নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট দাখিল হয়। এই সংখ্যাটি প্রথম দেখায় চমকে দেওয়ার মতো হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলেন এর বড় অংশই তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হয়। শিশু ও কিশোরেরা পরিবার থেকে অভিমান করে বেরিয়ে পরে ফিরে আসে, বয়স্করা হাসপাতালে ভর্তি হন এবং তাদের পরিচয় জানা যায়, কিংবা রানওয়ে কেসে কিশোর-কিশোরী নিজেই পরবর্তীতে যোগাযোগ করে।
তবে সব রিপোর্টের সমাধান হয় না। FBI-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, যেকোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় নিখোঁজ ব্যক্তির ফাইল থাকে প্রায় নব্বই থেকে এক লক্ষের কাছাকাছি। এই দীর্ঘমেয়াদী নিখোঁজ মামলাগুলোই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ।
বয়সের বিভাজনে দেখা যায়, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষত ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী। ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (NCMEC) জানায়, প্রতি বছর রিপোর্ট হওয়া নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যা চার থেকে পাঁচ লক্ষের মধ্যে থাকে। এর মধ্যে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো মানব পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। NCMEC-এর হিসেবে, রিপোর্ট করা নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সেক্স ট্র্যাফিকিংয়ের সম্ভাব্য শিকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি, তবে হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নিখোঁজের ক্ষেত্রে নারীরা অধিক ঝুঁকিতে থাকেন। জাতিগত বৈষম্যও এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট — কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী এবং হিসপানিক নিখোঁজদের মামলা মিডিয়া বা তদন্তকারীদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ পায়। যাকে গবেষকরা “মিসিং হোয়াইট উইমেন সিনড্রোম” নামক মিডিয়া পক্ষপাতের বিপরীত দিক হিসেবে বর্ণনা করেন।
নিখোঁজ মানুষের পেছনে সবচেয়ে ভয়াবহ কারণটি হলো অপরাধ — হত্যা, অপহরণ, মানব পাচার বা যৌন নির্যাতন। সিরিয়াল কিলারদের শিকার প্রায়ই নিখোঁজ হিসেবেই প্রথমে রিপোর্ট হয়, পরবর্তীতে তাদের দেহাবশেষ উদ্ধার বা পরিচয় শনাক্ত হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার টেড বান্ডি ১৯৭০-এর দশকে ওয়াশিংটন, ওরেগন, উতাহ, কলোরাডো এবং ফ্লোরিডায় কমপক্ষে ৩০ জন তরুণীকে হত্যা করেছিল বলে স্বীকার করে। তার অনেক শিকার বছরের পর বছর ধরে কেবল “নিখোঁজ” হিসেবেই পরিচিত ছিল।
বান্ডির গ্রেপ্তার ও পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসে যে সে কতটা পরিকল্পিতভাবে তার শিকারদের নির্বাচন করত এবং দেহ লুকিয়ে রাখত। একইভাবে গ্যারি রিজওয়ে, যাকে “গ্রিন রিভার কিলার” বলা হয়, ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে কমপক্ষে ৪৯ জন নারীকে হত্যা করেছিল। তার শিকারদের বেশিরভাগই ছিলেন যৌনকর্মী বা গৃহহীন, যাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পুলিশ প্রথম দিকে খুব বেশি মাথা ঘামায়নি বলে সমালোচনা উঠেছিল।
আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে গ্যাবি পেতিতোর মামলার কথা বলতে হয়। ২০২১ সালে ২২ বছর বয়সী এই তরুণী তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ভ্যানে করে দেশজুড়ে ভ্রমণ করছিলেন।
আগস্টের শেষে তিনি নিখোঁজ হন এবং সেপ্টেম্বরে ওয়াইওমিংয়ের গ্র্যান্ড টেটন ন্যাশনাল পার্কে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তার বয়ফ্রেন্ড ব্রায়ান লন্ড্রি পরে গুলি করে আত্মহত্যা করে। এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রে এক তীব্র সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেয়। গ্যাবির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা মিডিয়ায় ঝড় তুলেছিল, অথচ একই সময়ে নিখোঁজ হওয়া বহু কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামী বর্ণের মেয়েদের খবর প্রায় কেউ রাখেনি।
সব নিখোঁজের পেছনে যে অপরাধ থাকে তা নয়। একটি বড় সংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের জীবন থেকে পালিয়ে যান। ঋণের চাপ, পারিবারিক কলহ, মানসিক অসুস্থতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা একটি নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা — এসব কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পরিচিত পরিচয় ছেড়ে অন্য কোথাও নতুন করে জীবন শুরু করেন। এই ঘটনাকে বলা হয় “ভলান্টারি মিসিং” বা স্বেচ্ছায় নিখোঁজ।
২০০৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক সফল ব্যবসায়ী রে ম্যাকনিয়েল হঠাৎ গায়েব হয়ে যান। পরিবার ভেবেছিল হয়তো দুর্ঘটনা বা অপরাধ। কিন্তু বছর পাঁচেক পর জানা যায়, তিনি নতুন পরিচয়ে মেক্সিকোতে বাস করছেন, মোটা অঙ্কের ঋণ এবং ব্যর্থ বিবাহ থেকে পালাতে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝেইমারে আক্রান্ত বৃদ্ধ ব্যক্তিরা হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। আমেরিকায় প্রতি বছর ডিমেনশিয়া আক্রান্ত কয়েক হাজার মানুষ এভাবে “নিখোঁজ” হন।
মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও একটি বড় কারণ। বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় কেউ কেউ হঠাৎ সব ছেড়ে চলে যান, কোনো সংবাদ না রেখে। পরবর্তীতে অনেকে হোমলেস শেল্টারে, অন্য রাজ্যে বা সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে পাওয়া যান। এই ধরনের কেস পুলিশের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কারণ কোনো অপরাধ না হলেও পরিবারের কষ্ট কমে না।
কিছু নিখোঁজের ঘটনা এমন রহস্যের জন্ম দিয়েছে, যা দশকের পর দশক ধরে গোয়েন্দা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মনকে তাড়া করে বেড়ায়।
ডি বি কুপার (১৯৭১): এটি আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত নিখোঁজ মামলাগুলোর একটি। নভেম্বর ১৯৭১ সালে “ড্যান কুপার” নামে একজন রহস্যময় যাত্রী নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের একটি বিমান হাইজ্যাক করে, দুই লক্ষ ডলার মুক্তিপণ নেয় এবং বিমান থেকে প্যারাশুটে লাফ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তার পরিচয় বা পরিণতি আজও রহস্যময়। FBI কয়েক দশক তদন্ত চালিয়েছে, ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত স্থগিত রাখা হয়, কিন্তু মামলাটি এখনো খোলা। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন সে মারা গেছে, কেউ মনে করেন কোথাও চুপচাপ বেঁচে আছে।
ম্যাডেলিন ম্যাকক্যান (২০০৭): এটি আমেরিকান মামলা না হলেও বৈশ্বিক মনোযোগ এবং আমেরিকান মিডিয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। পর্তুগালের প্রাইয়া দা লুজে তিন বছর বয়সী এই ব্রিটিশ মেয়েটি তার পরিবারের হোটেল কক্ষ থেকে নিখোঁজ হয়। দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
স্টেসি পিটারসন (২০০৭): ইলিনয়ের এই তরুণী ২০০৭ সালে নিখোঁজ হন। তার স্বামী ড্রু পিটারসন, একজন সাবেক পুলিশ অফিসার, পরে তার তৃতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর জন্য দোষী সাব্যস্ত হন। স্টেসিকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জোই পপ্পা এবং বেলা বন্ড: শিশুদের নিখোঁজের রহস্যময় মামলার মধ্যে এগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বেলা বন্ড নামের এক ছোট্ট মেয়ের মৃতদেহ ২০১৫ সালে বোস্টনের একটি সৈকতে পাওয়া যায়, পরিচয় শনাক্ত হতে বছর লেগে গিয়েছিল। পরে তার মায়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই ধরনের ঘটনায় সমাজের চরম ব্যর্থতা উন্মোচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিং পার্সন সংকটের সবচেয়ে অবহেলিত দিকটি হলো নেটিভ আমেরিকান বা আদিবাসী নারীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা।
“মিসিং অ্যান্ড মার্ডার্ড ইন্ডিজেনাস উইমেন” বা MMIW নামে পরিচিত এই সংকটটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে ছিল। বিচার বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেটিভ আমেরিকান নারীরা অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি হারে সহিংসতার শিকার হন। কিছু রিজার্ভেশন এলাকায় হত্যার হার জাতীয় গড়ের দশগুণেরও বেশি। তবু এই মামলাগুলো কদাচিৎ মিডিয়া কভারেজ পায় এবং তদন্ত প্রায়ই নামমাত্র হয়। এই বৈষম্যের প্রতিবাদে আদিবাসী অ্যাক্টিভিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন।
একসময় নিখোঁজ মানুষের খোঁজ মূলত পুলিশের মুখাপেক্ষী ছিল। এখন ডিএনএ ডেটাবেস, ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যার, সামাজিক মাধ্যম এবং ক্রাউড-সোর্সড তদন্ত এই ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। NamUs (National Missing and Unidentified Persons System) একটি ফেডারেল ডেটাবেস যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তি এবং অশনাক্ত মৃতদেহের তথ্য সংরক্ষিত থাকে এবং ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি বছর বহু পুরনো মামলার সমাধান হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি সামাজিক সংবেদনশীলতাও জরুরি। নিখোঁজ মানুষের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, বৈষম্যহীনভাবে সব মামলায় সমান মনোযোগ দেওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসার — এই বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে নিখোঁজের সংখ্যা কমাতে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

