নরসিংদী প্রতিনিধি:
নরসিংদীতে মানবপাচার মামলার এক আসামিকে আদালতের হাজিরা ও গ্রেপ্তার এড়াতে ভিন্ন একজনকে আসামি সাজিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করানোর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
আদালত, কারাগার ও পুলিশের তদন্তে ঘটনাটির সত্যতা প্রাথমিকভাবে উদঘাটিত হওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে নরসিংদী মডেল থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটি বিচারিক অঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযোগকারী মো. গোলাম মাসুম বর্তমানে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরা চালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, নরসিংদীতে বেঞ্চ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে দায়ের করা অভিযোগে দুইজনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা হলেন হারুন মিয়া ও সেলিম।
অভিযোগে বলা হয়, মানবপাচার মামলা নং-১০/২০২৪ এর প্রকৃত আসামি সেলিমকে আদালতে হাজিরা ও কারাবাস থেকে রক্ষা করতে পরিকল্পিতভাবে হারুন মিয়াকে ব্যবহার করা হয়। এ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে হারুন মিয়াকে সেলিম পরিচয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, নরসিংদীর আদালতে হারুন মিয়া নিজেকে সেলিম পরিচয় দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন দাখিল করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশে ওইদিন বিকাল আনুমানিক ৩টার দিকে তাকে নরসিংদী জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তবে কারাগারে প্রবেশের সময় তার আচরণ ও পরিচয় নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কারাগার কর্তৃপক্ষ বন্দির পরিচয় যাচাইয়ের সময় জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম হারুন মিয়া বলে জানান। অথচ আদালতের পাঠানো অন্তর্বর্তীকালীন হাজত পরোয়ানায় তার নাম ছিল সেলিম।
বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে নরসিংদী জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ আদালতকে লিখিতভাবে অবহিত করে। জেল সুপার গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে পত্র নং-৫৮.০৪.৬৮০০.০৯৪.০৩.০২০.২৬-১৫১৪ মূলে ট্রাইব্যুনাল বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, আদালতের পরোয়ানায় বন্দির নাম সেলিম থাকলেও কারাগারে গ্রহণের সময় তিনি নিজের নাম হারুন মিয়া বলে পরিচয় দিয়েছেন।
জেল সুপারের ওই পত্র পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় রায়পুরা থানা-কে।
তদন্তের দায়িত্ব পান রায়পুরা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. যোবাইর হোসাইন। তিনি সরেজমিন তদন্ত, স্থানীয় অনুসন্ধান ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষে ট্রাইব্যুনালে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আদালতে সেলিম পরিচয়ে আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে হারুন মিয়া। মানবপাচার মামলা নং-১০/২০২৪ এর প্রকৃত আসামি সেলিম ও আত্মসমর্পণকারী হারুন মিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। তারা পরস্পর যোগসাজশে বিচারিক কার্যক্রমকে বিভ্রান্ত ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকৃত আসামি সেলিম, ভুয়া পরিচয়ে আদালতে হাজির হওয়া হারুন মিয়া এবং তাদের সহযোগী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আদালতে মিথ্যা পরিচয় প্রদান, বিচারিক কার্যক্রমে প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন ও প্রকৃত আসামিকে আড়াল করার মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ করেছেন।
এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে পেনাল কোড-১৮৬০-এর ১৮১, ১৯৩, ২০৫, ২০৯, ৪১৯ ও ৩৪ ধারায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে মিথ্যা তথ্য প্রদান, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, বিচারিক কার্যক্রমে প্রতারণা এবং সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এজাহারে অভিযোগকারী উল্লেখ করেন, আসামিরা অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে এ কাজ করেছেন। তাই জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতে ভুয়া ব্যক্তি হাজির করে বিচারিক কার্যক্রমকে বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনা বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি প্রকাশের পর নরসিংদীর আইন অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছে, প্রকৃত আসামিকে আড়াল করতে যদি ভিন্ন ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করানো হয়, তবে তা বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও তারা মত দেন।

