২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা তখন উত্তপ্ত। সংঘর্ষ, টিয়ারগ্যাস ও আতঙ্কের মধ্যেও এক তরুণ নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন পানির বোতল। তাঁর কণ্ঠে বারবার ভেসে আসছিল একটি মানবিক আহ্বান— “পানি লাগবে পানি?”
সেই তরুণ ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের পানি ও বিস্কুট বিতরণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর ঠিক আগে হাতে পানির বোতল নিয়ে ছুটে চলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা মুহূর্তেই লাখো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে।
আজ, ১৮ জুলাই ২০২৬। সেই ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলেও মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। তাঁর মানবিকতার প্রতীক হয়ে ওঠা সেই ডাক আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান, কিন্তু ন্যায়বিচারের অপেক্ষা রয়ে গেছে অপূর্ণ।
দুই বছরেও বিচার শেষ নয়
পরিবারের অভিযোগ, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। তারা বলছেন, এই সময়ে বহু আশ্বাস মিললেও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমন একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও কার্যকর বিচার প্রত্যাশা করলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাদের সেই আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
মানবিকতায় অনন্য এক তরুণ
১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর জন্ম নেওয়া মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন একজন উদ্যমী, পরোপকারী ও হাস্যোজ্জ্বল তরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ফ্রিল্যান্সিং করতেন এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
২০১৯ সালে বনানীর অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘জাতীয় পরিষেবা পুরস্কার’ অর্জন করেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম পরিচয়।
ইতিহাসে অমর এক নাম
মুগ্ধের শেষ মুহূর্তের সেই প্রশ্ন— “পানি লাগবে পানি?”— আজ শুধু একটি বাক্য নয়; এটি মানবিকতা, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অন্যের পাশে দাঁড়ানোর যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দুই বছর পরও তাঁর পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। আর মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে সেই তরুণ, যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অন্যের তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন।

