কোনো দেশ যুদ্ধ শুরু করার সময় সাধারণত ধরে নেয় না যে সেই সংঘাত বছরের পর বছর চলবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার এমন সামরিক অভিযানে জড়িয়েছে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্যয় ও জনমতের কারণে পরবর্তী প্রশাসনগুলোকে সেসব যুদ্ধ থেকে সরে আসতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নতুন যুদ্ধ শুরু না করে চলমান সংঘাতের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো “অন্তহীন যুদ্ধে” জড়াতে দেবেন না বলেই অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন সমালোচকরা।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে উত্তেজনার নতুন অধ্যায় শুরু হলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ঘোষিত দুটি প্রধান লক্ষ্য—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা—বাস্তবায়িত হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যে সমঝোতাকে ট্রাম্প প্রশাসন বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল, সেটিও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যকারিতা হারায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই ওই সমঝোতাকে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হিসেবে নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার একটি বিরতি হিসেবে দেখেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজের মতে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া শুধুমাত্র সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাঁর ভাষায়, সুস্পষ্ট শান্তি পরিকল্পনার অভাবে এই সংঘাত সহজেই একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
‘অন্তহীন যুদ্ধ’ ধারণাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর। এরপর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। প্রাথমিক সামরিক সাফল্য এলেও পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহ দমন, রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় বছর কেটে যায়। বিপুল ব্যয় ও প্রাণহানির পরও প্রত্যাশিত ফল অর্জিত হয়নি।
যুদ্ধ বিশ্লেষক লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যানের মতে, বড় শক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করে এবং দ্রুত বিজয়ের আশা করে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত জটিলতা তাদের সেই হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে।
তিনি বলেন, ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন—উভয়েই এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা দ্রুত সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই সাফল্যকে টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে রূপ দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট, কারণ তারা স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিবর্তে মূলত বিমান ও নৌ-অভিযানের ওপর নির্ভর করছে।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধকে সফল সামরিক অভিযানের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়, কারণ তখনকার মার্কিন লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু পরবর্তী ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান অভিযানে লক্ষ্য বিস্তৃত হওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং প্রত্যাশিত ফল আসেনি।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থানের কারণে ট্রাম্প ধীরে ধীরে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন, যার প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়; লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনেও এর প্রভাব বিস্তার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প চাইলে বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে আরও গভীরভাবে এতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন অঙ্গীকার এবং ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বজায় রাখার অবস্থান ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংঘাত আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের মতো নয়। কারণ এখানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দুর্বল রাষ্ট্র বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত রাষ্ট্রের মুখোমুখি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবহন এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইরান যদি এই পথকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞ সুজান মালোনির মতে, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া এখন আর সহজ নয়। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে ইতোমধ্যেই বড় পরিবর্তন এসেছে এবং ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দীর্ঘ সময় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের ধারণা—বর্তমান অবস্থায় দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে ইরানকে ঘিরে সংঘাত ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি বা ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ রূপ নিতে পারে।

