মোঃ রেজাউল হক শাকিল, ব্রাহ্মণপাড়া:
আষাঢ়ের শেষ সময়ে এসে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় গোমতী নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। নদী এখন পানিতে টইটম্বুর। চারিদিকে থইথই করছে সাদা পানি, বাতাসের তোড়ে নদীর বুকে ঢেউ খেলছে।
গত ২০২৪ সালের আগস্টে গোমতীর বাঁধ ভেঙে হওয়া ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি উপজেলার মানুষের। সেই বন্যায় হাজার হাজার কৃষক ফসল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন। সেই স্মৃতি মনে করে এবারও নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।
সরেজমিনে গোমতী নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানি বাড়ার কারণে চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নদীর তীরবর্তী আসান নগর এলাকার কৃষক মতি মিয়া তাঁর দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে বলেন, “গতবারের বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসল সব ভাসাইয়া নিছিল। এনজিওর ঋণ আর ধারদেনা কইরা এবার আবার জমিতে ফসল ফলাইছিলাম। যেভাবে পানি বাড়তাছে, আল্লায় না করুক আবার যদি বন্যা হয়, তবে আমাগো না খাইয়া মরণ ছাড়া উপায় থাকব না।”
একই এলাকার আরেক কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে রাইতে ঘুম আহে না। বাঁধের দিকে তাকাইয়া থাকি। পানি চরের জমির কাছাকাছি চইলা আইছে। যেকোনো সময় ফসল তলাইয়া যাইতে পারে। আমরা খুব আতঙ্কে আছি।”
নদী পাড়ের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মনিরুল আলম বলেন, “গত ২৪ সালের বন্যার ভয়াবহতা আমরা এখনো ভুইলা যাই নাই। বাঁধ ভাইঙা যে সর্বনাশ হইছিল, তা কাটাইয়া উঠতে পারি নাই। এবার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে নতুন কইরা আতঙ্ক দেখা দিছে। বাঁধের দুর্বল জায়গাগুলো দ্রুত মেরামত করা দরকার, নাইলে যেকোনো সময় বড় বিপদ ঘটতে পারে।”
এদিকে চরাঞ্চলের ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগও।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন বলেন, “টানা বর্ষণে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করছে, যা খুবই স্বাভাবিক। আমরা মাঠ পর্যায়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ফসলের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। তবে পানি আরও বৃদ্ধি পেলে চরাঞ্চলের ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার জানান, গতকাল পর্যন্ত গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল, তবে আজকে থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবুও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এবং নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের সঠিক তদারকি না করা হলে চরাঞ্চলের শত শত হেক্টর ফসলি জমি আবার পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

