মোঃতাইজুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট):
কখনো কখনো ভালোবাসা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিলতাকেও হার মানায়। আত্মত্যাগের এমন কিছু গল্প মানুষের হৃদয়ে আজীবন জায়গা করে নেয়। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার দুই বোন আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি ও ইসমত আরা ইতির গল্পও তেমনই এক অনন্য মানবিকতার কাহিনি।
মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ছোট বোনকে বাঁচাতে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করে নতুন জীবনের আলো জ্বালিয়েছেন বড় বোন আঁখি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে লিভার প্রতিস্থাপন। অস্ত্রোপচারের পর দুই বোনই চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাদের শারীরিক অবস্থা সন্তোষজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শরণখোলা উপজেলার ২ নম্বর খোন্তাকাটা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আলমগীর তালুকদারের ছোট মেয়ে ইসমত আরা ইতি দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। শরণখোলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইতির শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। কিন্তু ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা পরিবারটির জন্য ছিল এক কঠিন বাস্তবতা।
এমন সংকটময় মুহূর্তে বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করার সিদ্ধান্ত নেন। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী আঁখির এই সাহসী সিদ্ধান্ত পরিবারকে নতুন আশার আলো দেখায়।
চিকিৎসার প্রস্তুতিতে কেটে যায় টানা পাঁচ মাস। হাসপাতাল, অসংখ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা, প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহ এবং বিপুল অর্থের ব্যবস্থা করতে পরিবারকে পাড়ি দিতে হয় কঠিন সংগ্রামের পথ। এ সময় স্থানীয় সংবাদকর্মী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা সহায়তার জন্য এগিয়ে আসেন। দেশ-বিদেশের অনেক মানবিক মানুষের আর্থিক সহযোগিতা এবং স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের অংশগ্রহণে চিকিৎসার পথ অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে।
অস্ত্রোপচারের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় আঁখি লিখেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি বোনদের বলতেন, “আমি তোদের ভাইও। একজন ভাই তার বোনের জন্য যা করতে পারে, আমিও তাই করব।” নিজের লিভারের অংশ দানকে তিনি কোনো ত্যাগ নয়, বরং একজন বড় বোনের দায়িত্ব ও ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার একমাত্র চাওয়া ছিল ছোট বোন সুস্থ হয়ে আবার হাসিমুখে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক।
অস্ত্রোপচারের আগে বাবা আলমগীর তালুকদার দেশবাসীর কাছে দুই মেয়ের জন্য দোয়া কামনা করেছিলেন। সেই প্রার্থনা, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা এবং চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় অবশেষে সফল হয় এই জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচার।
সফল অস্ত্রোপচারের পর ইতির পরিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট টিমের চিকিৎসক, নার্স এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় বহনে সহায়তাকারী, রক্তদাতা এবং বিভিন্নভাবে পাশে দাঁড়ানো সব শুভানুধ্যায়ী মানুষের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে পরিবার।
শরণখোলা থেকে উঠে আসা এই ঘটনা শুধু একটি সফল লিভার প্রতিস্থাপনের খবর নয়; এটি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দলিল। দুই বোনের এই গল্প আজ দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। সবার একটাই প্রার্থনা দ্রুত সুস্থ হয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আপনজনের কাছে ফিরে আসুক আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি ও ইসমত আরা ইতি।

