চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে ইরান ও ইরাকজুড়ে চলছে নজিরবিহীন আয়োজন। দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে টানা ছয় দিনব্যাপী এই কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে তেহরান। এই ঐতিহাসিক বিদায়ী অনুষ্ঠানে এক থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই নেতার প্রয়াণে যখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে, ঠিক তখনই তাঁর জীবনের বিভিন্ন শিক্ষণীয় দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিশদ আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, খামেনির রচিত আত্মজীবনী ‘সেল নম্বর ১৪’ (Cell No. 14) বইটি এই মুহূর্তে পাঠক ও বিশ্লেষকদের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। বইটিতে তিনি তাঁর দীর্ঘ বিপ্লবী সংগ্রাম, কারাজীবন এবং জীবনের নানা কঠিন অধ্যায়ে স্ত্রী মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাগেরজাদেহর অনবদ্য ও ত্যাগী ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন।
নিজের আত্মজীবনীতে খামেনি তাঁর জীবনের কঠিন সময়ে স্ত্রীর সক্রিয় ভূমিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ইরানের সাবেক শাহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘সাভাক’-এর বর্বর নির্যাতনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘আমার স্ত্রী দৃঢ় ও উচ্চ মনোবলের অধিকারী। সাভাকের দোসরদের দ্বারা আমাদের বাড়িতে বারবার হামলা এবং তার চোখের সামনেই আমার বারবার গ্রেপ্তার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো ভয়, দুর্বলতা বা মানসিক ভাঙনের কোনো লক্ষণ প্রকাশ করেননি।’
এমনকি গভীর রাতে ঘরে ঢুকে সাভাক এজেন্টরা খামেনিকে মারধর করার পরও তাঁর স্ত্রী অটল ছিলেন উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমার কারাবাসের সময় তিনি আমাকে দেখতে আসতেন এবং প্রতিবারই তার উচ্চ মনোবল ও দৃঢ় চরিত্র প্রকাশ পেত। তার সাক্ষাৎ আমাকে আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিত। সন্তানদের অসুস্থতা বা কোনো দুঃসংবাদ তিনি কখনো আমাকে কারাগারে জানাতেন না।’
ইসলামী বিপ্লবের আগের কঠিন সময় এবং বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থাকার পরও খামেনি ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। খামেনি লিখেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে, আমাদের ঘর সর্বদা বিলাসিতা ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে মুক্ত ছিল—এমনকি সেসব জিনিস থেকেও, যা সাধারণ ঘরেও দেখা যায়।’ এই সংযমী জীবনধারা বজায় রাখতে তাঁর স্ত্রীর অবদান নিজের চেয়েও বেশি ছিল বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
স্ত্রীর সরলতার বিবরণ দিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘তিনি কখনো আমাকে নিজের জন্য পোশাক কিনে দিতে বলেননি; কেবল সন্তানদের প্রয়োজনীয় পোশাকের কথা মনে করিয়ে দিতেন। তিনি কখনো গয়না কেনেননি। বরং তার বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের দেওয়া সব মূল্যবান অলঙ্কার বিক্রি করে সেই অর্থ দান-খয়রাতে ব্যয় করেছেন। বর্তমানে তার কাছে কোনো অলঙ্কারই নেই—এমনকি একটি সাধারণ আংটিও নয়।’
একদিকে খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইরান-ইরাকে কোটি মানুষের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের এমন সরল ও বিপ্লবী দিকগুলোর উন্মোচন—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলোতে এখন আলোচনার শীর্ষে ইরানের এই সাবেক শীর্ষ নেতা।

