কুরআন কেবল সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগের কোনো ইতিহাস গ্রন্থ নয়, বরং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এটি কতটা জীবন্ত এবং প্রাসঙ্গিক—তা বিশ্ব দেখল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষশ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে। শোকের সেই মঞ্চকে ইরান রূপ দিল এক ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক বার্তার আঙিনায়!
ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধে যে দেশ ঠিক যেমন ভূমিকা পালন করেছে, খামেনির শেষ বিদায়ে আসা সেই দেশের প্রতিনিধিদের সামনে ঠিক তাদের চরিত্রের সাথে মিল রেখে কুরআনের নির্দিষ্ট কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে কোনো দেশের নীতি ও অবস্থানকে এভাবে কুরআনের আয়াতের আয়নায় খোলামেলাভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ঘটনা এককথায়—আনথিংক্যাবল, আনবিলিভেবল!
আজকের ভিডিওতে আমরা দেখব, খামেনির শেষ বিদায়ে আসা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে কীভাবে মাত্র কয়েকটি আয়াতের মাধ্যমে তাদের আসল রূপ দুনিয়ার সামনে উন্মোচিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে হামাস এবং গাজার প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা হয় সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত:
“মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহর কাছে করা নিজেদের ওয়াদা সত্য প্রমাণ করে দেখিয়েছে। তাদের কেউ কেউ নিজের ওয়াদা পূরণ করেছে, আর কেউ কেউ নিজেদের পালার অপেক্ষায় আছে। তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে একচুলও সরে আসেনি।”
ইতিহাসের দিকে তাকান। খন্দকের যুদ্ধে যখন গোটা আরব মদিনাকে পিষে ফেলার জন্য চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল, এমনকি মদিনার ভেতরের মুনাফিক ও ইহুদিরাও পেছন থেকে ছুরি মারার প্রস্তুতি নিচ্ছিল—ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল।
আজকের গাজার দিকে তাকান। দুই দশক ধরে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত কারাগার এই গাজা আজ চারদিক থেকে অবরুদ্ধ। কিন্তু এখানকার প্রতিরোধযোদ্ধা হামাসের নেতারা একের পর এক শহীদ হচ্ছেন, অথচ তারা পিছু হটেননি। যারা বেঁচে আছেন, তারাও নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে একচুলও সরেননি। খন্দকের যুদ্ধের সেই অবরুদ্ধ মদিনার চেয়ে চমৎকারভাবে আজকের গাজার চিত্র আর কীসে ফুটে উঠতে পারে?
এরপর আসে হিজবুল্লাহর প্রসঙ্গ। তাদের জন্য বেছে নেওয়া হয় সূরা আল ইমরানের ১৩ ও ১৪০ নম্বর আয়াত:
“তোমরা মন খারাপ করো না, হতাশ হয়ে পড়ো না। তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকারের মুমিন হও। তোমরা যদি আঘাত পেয়ে থাকো, তবে তোমাদের শত্রুরাও কিন্তু ঠিক একইভাবে আঘাত পেয়েছে…”
উহুদের যুদ্ধের শুরুতে মুসলিমদের সাময়িক বিপর্যয় ঘটেছিল। মুসলিমরা যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করে বলেন—ক্ষতি শুধু তোমাদের হয়নি, শত্রুপক্ষও সমানভাবে আঘাত পেয়েছে। আজ হিজবুল্লাহর সাময়িক ক্ষতি বা নেতাদের শাহাদাতে যারা ভাবছেন তারা শেষ, এই আয়াত তাদের মনে করিয়ে দেয়—দিনগুলোর হাতবদল হয় খাঁটি মুমিন ও শহীদদের বাছাই করার জন্য।
সবচেয়ে চমকপ্রদ কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে চীন এবং সৌদি আরবকে।
চীনের প্রতিনিধিদের শোনানো হয় সূরা আল-আনফালের ১০ নম্বর আয়াত। বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা পাঠিয়ে আল্লাহ বুঝিয়েছিলেন, সাহায্য কেবল সান্ত্বনা মাত্র, আসল বিজয় আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। চীনকে এই আয়াত শুনিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে—তোমরা যতই ভূ-রাজনৈতিক বা সামরিক সাহায্য করো না কেন, চূড়ান্ত বিজয় কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহর ওপর এই অবিচল আস্থা সত্যিই অনন্য!
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধামাকা আর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা ছিল সৌদি আরবের ক্ষেত্রে। তাদের শোনানো হয় সূরা আল ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত, যেখানে বদরের যুদ্ধে কাফের ও মুসলিমদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের রহস্যময় ও নীরব ভূমিকাকে যেন এক আয়াতেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। এই আয়াত যখন তিলাওয়াত করা হচ্ছিল, তখন সৌদি ডেলিগেশনের সেই ভদ্রলোকের চেহারার দিকে জাস্ট তাকান! অসীম, অর্থহীন এক শূন্যদৃষ্টি! তারা খুব ভালো করেই বুঝেছিল ইরান তাদের সামনে এই আয়াত পড়ে ঠিক কী বার্তা দিতে চাইছে। আর সে কারণেই আজ টুইটার বা এক্স ফ্লাডেড হয়ে গেছে এই আয়াতের ব্যাখ্যা আর সৌদি প্রতিনিধিদের সেই রিয়্যাকশন নিয়ে!
কাতার ও তুরস্কের কূটনৈতিক বৈঠকের ছবি। বিশেষ করে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর চুক্তির খসড়া লেখার দৃশ্য।)
কূটনৈতিক অঙ্গনে কাতারের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে সূরা আল-ফাতহ-এর আয়াত, যা হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নাজিল হয়েছিল। ‘এক দুর্দান্ত বিজয়ের’ এই আয়াতটি কাতারের কূটনৈতিক সফলতার সাথে হুবহু মিলে যায়। মার্কিনদের সাথে চুক্তির খসড়া লেখার টেবিলে কাতারের প্রধানমন্ত্রী আবদুর রহমানের উপস্থিতিই তার প্রমাণ।
অথচ অন্যদিকে, তুরস্ককে দেওয়া হয়েছে এক চরম খোঁচা! তাদের সামনে পড়া হয় সূরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত:
“যারা নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে, আল্লাহ তাদেরকে বসে থাকা লোকদের চেয়ে মর্যাদায় অনেক ওপরে রেখেছেন।”
মদিনার প্রতিরক্ষায় যে মুনাফিকরা সবসময় যুদ্ধের মাঠে না গিয়ে ঘরে বসে থাকার অজুহাত খুঁজত, তাদের ভর্ৎসনা করে এই আয়াত নাজিল হয়। আজ সামরিক শিল্পে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং অস্ত্র রপ্তানিতে ৫ নম্বরে থাকা তুরস্কের ‘নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলা’র যে নীতি—তাকে খোঁচা দেওয়ার জন্য এর চেয়ে মোক্ষম আয়াত আর কী হতে পারে?
ইরানের এই অভিনব কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্ট সেকশনে আমাদের জানান।

