সত্যজিৎ দাস, মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের কালিঘাট-হোসনাবাদ (হোসনাবাদ-বিলাসছড়া) সড়ক সংস্কার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বুধবার (১ জুলাই) প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের হোসনাবাদ গ্রামসহ সাতটি চা-বাগান এলাকার প্রধান যোগাযোগ সড়ক এটি। প্রতিদিন ভারী ট্রাক,জিপ,সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন এবং হাজারো চা-শ্রমিক এই সড়ক ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহনের চাপ ও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে সড়ক সংস্কারের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কালিঘাট-মনু-দলই সার্কুলার রোড সংস্কারের জন্য ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কাজটি বাস্তবায়ন করছে কমলগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজ।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ,শুরু থেকেই প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্ধারিত মানের পাথর ও খোয়ার পরিবর্তে পুরোনো ইটের খোয়া,রাবিশ ও ময়লাযুক্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। গাইডওয়ালের জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতায় খনন না করে অল্প গভীরতায় কাজ শেষ করা হচ্ছে। এছাড়া আরসিসি ঢালাইয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম রড ও সিমেন্ট ব্যবহার,যথাযথ কমপ্যাকশন না করা এবং পুরোনো গাইডওয়াল সংস্কার করে তার ওপর নতুন কাঠামো নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। এতে নির্মাণাধীন সড়কের বিভিন্ন অংশে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের ভাষ্য,দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করছে। ফলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় গত রোববার (২৮ জুন) সকালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়কের অবশিষ্ট অংশের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
হোসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন,“কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা সংস্কার করা হচ্ছে, অথচ পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখভালের কেউ না থাকলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?”
স্থানীয় বাসিন্দা বিনোদ তাঁতি ও সঞ্জয় মুন্ডা বলেন,নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণেই এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
পথচারী নুরুল ইসলাম বলেন,“কোটি টাকার প্রকল্প হলেও কাজে মানের কোনো ছাপ নেই। এভাবে কাজ চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।”
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক জাফর আলী বলেন,“আমরা ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। কোন উপকরণ ব্যবহার করতে হবে,সে সিদ্ধান্ত আমাদের নয়।”
এলজিইডির কার্যসহকারী আবু বকর সিদ্দিক বলেন,“শিডিউল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। তবে স্যালভেজের কারণে ইটের মান কিছুটা নিম্নমানের।”
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হাসানুজ্জামান বলেন,চুক্তি অনুযায়ীই কাজ করা হচ্ছে। তিনি জানান, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সরকার থেকে ৭৫ লাখ টাকায় স্যালভেজের ইট কিনে তা ভেঙে খোয়া হিসেবে আরসিসি ঢালাইয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরোনো অংশে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও তা প্রয়োজনীয়ভাবে মেরামত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় পণ্ডিত বলেন,দুই কিলোমিটার সড়কে ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি প্রশস্ত আরসিসি ঢালাইয়ের জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকা। এর মধ্যে স্যালভেজ বাবদ ৭৫ লাখ টাকা সরকারি তহবিলে জমা হবে। অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,“সব কাজ নিম্নমানের হচ্ছে,এমনটি ঠিক নয়। তবে কাজের ক্ষেত্রে কিছু কমবেশি হয়েছে।”
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, “আমি মাঝেমধ্যে কাজ পরিদর্শনে গিয়েছি। নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ওপর রয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করে কোথাও নিম্নমানের উপকরণ পাওয়া গেলে তা অপসারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান পরিদর্শন করে বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বুধবার (১ জুলাই) তিন দিন ধরে বন্ধ থাকা নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান,উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকী। এ সময় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য দরুদ মিয়া,উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন জারু,বিএনপি নেতা মশিউর রহমান রিপন,আশিদ্রোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রনেন্দ্র প্রসাদ বর্ধন জহর, শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল হোসেন এবং স্থানীয় সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি,অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রকল্পে শতভাগ মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করা হোক,যাতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এলাকাবাসী একটি টেকসই সড়ক সুবিধা পান।

